আজকের দিনে ২০তম জেলা হিসেবে জামালপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে

ফারিয়াজ ফাহিম 
স্বাধীন নিউজ, জামালপুর প্রতিনিধি।
আজ ২৬ ডিসেম্বর,১৯৭৮ সালের এই দিনে
দেশের ২০তম জেলা হিসেবে জামালপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।যাহার প্রাচীন নাম ছিল সন্ন্যাসীগঞ্জ।
প্রাচীন বঙ্গের গৌড়ের সেন বংশের রাজত্বকালে (১১০০-১২০৩ খ্রী:) হিন্দুদের মধ্যে যখন কলীন প্রথার প্রচলন হয়, তখন এই এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠে। এ সময় গঞ্জের হাটের কাছের একটি এলাকায় শিবমিন্দর স্থাপিত হয়। পরবর্তী সময়ে কাছাকাছি এলাকায় স্থাপিত হয় দয়াময়ী মন্দির। একসময় শিবমন্দিরকে ঘিরে একশ্রেণীর হিন্দু সন্ন্যাসীদের আনাগোনা শুরু হয় এই অঞ্চলে। পরে দূরদেশ থেকে আগত এই সব হিন্দু সন্ন্যাসীরা আস্তানা গড়ে এই শিবমন্দিরে। হিন্দু সন্ন্যাসীদের আগমনে এবং তাদের পদচারণায় অঞ্চলটি “গঞ্জের হাট” থেকে “সন্ন্যাসীগঞ্জ” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ক্রমান্বয়ে হিন্দু জমিদারদের উদ্ভব হলে সন্ন্যাসীগঞ্জকে মৌজা তৈরি করে এর নাম রাখেন “সিংহজানী”। এই সিংহজানী মৌজা থেকেই আজকের জামালপুর জেলা।
জামালপুর জেলার ইতিহাস সম্পর্কে সঠিকভাবে ধারণা পেতে হলে প্রখ্যাত আউলিয়া হযরত শাহ জামাল (র:) ও হযরত শাহ কামাল (র:) এ দুই বুজুর্গ ব্যক্তির নাম স্মরণ করতে হয়। ইসলাম তথা মানবতার বাণী প্রচারের জন্য হযরত শাহ জামাল (র:) দিল্লীর বাদশাহ আকবরের সময়কালে সুদূর ইয়েমেন দেশ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য জামালপুরে তশরিফ রাখেন। জামালপুর শহরের আদি নাম সিংহজানী। হযরত শাহ জামালের (র:) নামে কোন মৌজা, গ্রাম হাট-বাজার কিছুই নেই।  আমাদের পরম সৌভাগ্য যে এ পূণ্যবান ব্যক্তির মাজার শরীফ জামালপুর শহরে অবস্থিত। তাঁর পবিত্র নামেই এ জেলার নামকরণ করা হয়েছে।
জামালপুর ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে প্রথম মহকুমা হিসেবে ১৮৪৫ সালে মর্যাদা লাভ করে। মহকুমা সৃষ্টি হওয়ার ১৩৩ বছর পরে ১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর জেলার মর্যাদা পায়। জামালপুর জেলা গঠনের আন্দোলন মূলত: বঙ্গভঙ্গের পরে ১৯১২ সালেই সূচীত হয়। ১৯১২ সালে লর্ড কার্জন জামালপুরকে জেলা করার ঘোষণা দেন। ১৯১৯ সালের দিকে ধনবাড়ীর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ধনবাড়ীকে জেলা সদর করে জামালপুর ও টাঙ্গাইলকে নিয়ে একটি জেলা করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু এতে জামালপুর ও টাঙ্গাইলবাসী কোন পক্ষই সমর্থন করেনি। ১৯০৮ সালে শেরে-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক জামালপুর এর মহুকুমা প্রশাসক থাকার সময় জামালপুরকে জেলা করার দাবী আরো বেগবান হয়ে উঠে। জামালপুরকে জেলা হেডকোয়ার্টার করার জন্য ১৯১৭ সালে জামালপুর পৌর এলাকায়  ২৩৫ একর জমি সরকার অধিগ্রহণ করে। ১৯২০ সালে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর থানার কয়েকটি গ্রাম সরিষাবাড়ী থানার সাথে সংযুক্ত করা হয়। ১৯৩৮ সালে তৎকালীন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের উদ্যোগে জামালপুরকে জেলা করার দাবী সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। জামালপুর না টাঙ্গাইল কোথায় জেলা সদর হবে এ নিয়ে তৎকালীন বৃটিশ সরকারও কোন সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। এ সময়ে বন্যা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইতাদি কারণে জামালপুর জেলার বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়ে। ঐ সময়ে কংগ্রেস ও মুসলিমলীগের বহু প্রভাবশালী নেতা থাকলেও নিজেদের কোন্দলের কারণে তারা জামালপুর জেলার বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি, যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট তুলে ধরতে পারেননি জামালপুর জেলা গঠনের প্রয়োজনীয়তা। যে কারণে জামালপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হতে প্রায় ১৩৩ বছর সময় লেগেছে।
১৯৭১ সালে ১০ ডিসেম্বর জামালপুর হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার  পরেই জামালপুরকে জেলা করার দাবী আবারো বেগবান হয়ে উঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭৫ সালে জামালপুরকে জেলা করার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭৮ সালে ২৬ ডিসেম্বর জামালপুর বাসীর জন্য একটি আনন্দের দিন। কারণ এ দিনে জামালপুরকে স্বাধীন বাংলাদেশের ২০তম জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
জামালপুর জেলা সৃষ্টির প্রতিষ্ঠা লগ্নে যে সকল সরকারী কর্মকর্তা বিশেষ অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব জনাব কেরামত আলী, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার জনাব খানে আলম খান, ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক জনাব বদিউর রহমান, জামালপুর মহকুমা প্রশাসক জনাব আব্দুর রশিদ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
এ জেলার ভৌগলিক অবস্থান খুবই মনোমুগ্ধকর। বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে গারো পাহাড়ের পাদদেশে নৈসর্গিক দৃশ্য ও নয়নাভিরাম  প্রাকৃতিক লীলাভূমি যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র,ঝিনজিরাম, ঝিনাই ও বানার নদীর পলি বিধৌত অববাহিকায় প্রখ্যাত সাধক আউলিয়া হযরত শাহ্ জামাল (রহ:) ও হযরত শাহ্ কামাল (রহ:) এর পূণ্য স্মৃতিধন্য ভূমিতে জামালপুর জেলার  অবস্থান।।
এই ওয়েবসাইটের সকল লেখার দায়ভার লেখকের নিজের, স্বাধীন নিউজ কতৃপক্ষ প্রকাশিত লেখার দায়ভার বহন করে না।
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -