ইসলাম প্রচারে প্রযুক্তির ব্যবহার

0
3

উম্মে আহমাদ ফারজানা।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত দ্বিনের প্রচার ও প্রসার করা। নবী করিম (সা.)-এর যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যুগে যুগে ইসলামের মনীষীরা এই গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ধর্ম প্রচারে গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দাওয়াত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। যেমন—

ফেসবুক : আধুনিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যমের একটি বিষয় হলো ফেসবুক।

যার মাধ্যমে বিভিন্ন সময় প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও বার্তা আদান-প্রদান করা হয়। নতুন প্রজন্মের একটি অন্যতম আকর্ষণ হলো ফেসবুক। বর্তমানে এটি অত্যধিক জনপ্রিয় একটি প্রযুক্তি, যা উন্নত যোগাযোগ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। মুসলমানরা যদি এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে এটি ইসলাম প্রচারে একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে।

ই-মেইল : নবী (সা.)-এর যুগে দূরদেশে দাওয়াত প্রচারের মাধ্যম ছিল দূতের মাধ্যমে চিঠি প্রেরণ। এরপর পোস্ট অফিসের মাধ্যমে চিঠির দ্বারা বিভিন্নভাবে মুসলমানরা দূরদেশে ইসলামের দাওয়াত প্রচার করেছেন। বর্তমানে আধুনিক যুগে আমরা আরো একটি প্রযুক্তি সচরাচর ব্যবহার করে থাকি, সেটি হলো মেইল। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ইসলামের দাওয়াত সহজেই পৌঁছে দিতে পারে।

ইলেকট্রনিক মিডিয়া : আধুনিক প্রযুক্তির অপর একটি দিগন্ত হলো স্যাটেলাইট চ্যানেল। এটির মাধ্যমে একজন দাঈ সারা বিশ্বের মানুষের মাঝে ইসলামী দাওয়াত প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখতে পারেন।

ইউটিউবে আপলোড : একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির অন্য একটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হলো ইউটিউব। দাওয়াত প্রচার ও প্রসারে আধুনিক প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে। ইন্টারনেটে বিভিন্ন ভিডিও আপলোড ও ডাউনলোড করার উল্লেখযোগ্য একটি ওয়েবসাইট হলো ইউটিউব।

যেখানে একজন ব্যক্তি যেকোনো অডিও এবং ভিডিও আপলোড করতে পারে। এ বিষয়টিকে আমরা সবাই ইচ্ছা করলে ভালো ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারি। কাজেই এটিও ইসলাম প্রচারের উল্লেখযোগ্য একটি মাধ্যম। 
ইসলামিক প্রগ্রাম সম্প্রচার : ইসলাম প্রচারের অপর একটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হলো, বিভিন্ন প্রগ্রামের অডিও ও ভিডিও ধারণ করে তা বিভিন্ন গণমাধ্যমের দ্বারা সম্প্রচার করা।

ব্লগ : যোগাযোগ মাধ্যমের একটি বৃহৎ মাধ্যম হলো ইন্টারনেট। এই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি বিভিন্ন নামে ব্লগ তৈরি করেন। আর সেখানে তাঁরা নিজস্ব মতামত ও নানাবিধ লেখা পোস্ট করে থাকেন। আধুনিক কালে দেখা যায়, অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন নামে ব্লগ পরিচালিত করে থাকেন, যেখানে ইসলামপন্থী ও যুবসমাজকে ধ্বংসের পথ থেকে হিদায়াতের পথে আহ্বানের জন্য বিভিন্ন লেখা পোস্ট করে থাকেন। এটি নিশ্চয়ই একটি প্রশংসনীয় কাজ।

পত্রপত্রিকা : বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের দৈনিক, পাক্ষিক, দ্বিপাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকার মাধ্যমে ইসলামী দাওয়াতের বিভিন্ন কলাম প্রকাশের মাধ্যমে দাওয়াতের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপ্লব সাধন করা সম্ভব, যা অন্য কোনো মাধ্যমে সহজে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। কেননা পত্রপত্রিকা একেবারে নিম্নশিক্ষিত থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যন্ত সর্বস্তরের লোক পড়ে থাকে। কাজেই সেখানে যদি সত্যের দাওয়াত সম্পর্কিত কোনো লেখা প্রকাশ করা হয় তাহলে এটি দাওয়াতের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে, যা সংঘাতময় বর্তমান সময়ে অনেক শূন্যতাকে পূরণ করতে পারে।

সফটওয়্যার : বর্তমান বিশ্বে কম্পিউটার এমন এক প্রযুক্তির নাম—পৃথিবীর সব কিছুতেই যার ছোঁয়া অপরিহার্য। এর অবদান অনস্বীকার্য। পৃথিবীর সব যন্ত্রই বর্তমানে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত তথা কম্পিউটারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্যে পরিচালিত। লেখাপড়া, সাহিত্যচর্চা, সাহিত্য-কলা সব কিছুতেই কম্পিউটার প্রসারিত করেছে তার সাহায্যের হাত। উন্নত বিশ্বে কৃষি, বাণিজ্য, চাকরি থেকে শুরু করে হেন কোনো পেশা নেই, যাতে কম্পিউটারের সাহায্য নেওয়া হয় না। এই মাধ্যমকে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে অনেক সহজে ও সফলতার সাহায্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। কম্পিউটারের মাধ্যমে আজকাল কোরআন, হাদিস, বিভিন্ন ইসলামী রেফারেন্স গ্রন্থ পড়া ও সংরক্ষণ করা, ভিডিও দেখা, অডিও শোনা প্রভৃতি অনেক সহজতর হয়েছে। এখন কোরআন-হাদিস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সফটওয়্যার আছে। এগুলোতে সহজেই একটি সুরা থেকে অন্য সুরায় যাওয়া যায়, বিভিন্ন আয়াত বের করা যায়, বিভিন্ন শব্দ দিয়েও আয়াত বের করা যায়। হাদিসের ক্ষেত্রেও এ রকম সফটওয়্যার বিদ্যমান।

ওয়েব মিডিয়া : ওয়েব মিডিয়ায় মুসলমানদের অবস্থান খুব দুর্বল। বিশেষ করে নৈতিকতার চর্চা এখানে খুবই নগণ্য। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, অমুসলিম ও ইহুদিদের সাইট মুসলমানদের সাইটের তুলনায় ১২০০ গুণ বেশি। অশ্লীলতা ও নীল ছবির সয়লাব এত বেশি যে অল্প কিছু মুসলিম সাইটের অবস্থান সে তুলনায় অপ্রতুল। তাই আরো অনেক ওয়েবসাইট, ব্লগ গঠনে এগিয়ে আসার পাশাপাশি নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে।

সোশ্যাল মিডিয়া : বর্তমানে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত এই মিডিয়ায় আসক্ত। এই মিডিয়ার মাধ্যমে ইসলাম প্রচার অনেক সহজ এবং দ্রুতগতিতে তা ছড়িয়ে পড়ে। দাওয়াতের ক্ষেত্রে ইসলামী মূলনীতি অনুসরণ করে সঠিক তথ্য-প্রমাণসহ আলোচনা দাওয়াতকে বেগবান করবে বলে আশা করা যায়। এ ছাড়া অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া যেমন—টুইটার, বেশতো, উম্মাহল্যান্ড, লিংকডইন, গুগল প্লাস, ইনস্টাগ্রামেও ইসলামবিষয়ক লেখা, ছবি পোস্ট করা সময়ের দাবি।

মোবাইল : আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক নব আবিষ্কার হলো মোবাইল ফোন। ধনী-গরিব, রিকশাচালক-ভ্যানচালক, নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, শিশু-কিশোর সবার হাতেই এখন মোবাইল। মোবাইল ফোন যেন আজকাল জীবনের একটি আবশ্যিক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এটা মানুষের জীবনকে করেছে গতিময়।

স্মার্টফোনের মাধ্যমে ইসলামী লেকচার, টিউটোরিয়ালের অডিও-ভিডিও শোনা ও দেখা যায়। একটি মাত্র ছোট্ট মেমোরিতে অসংখ্য বক্তব্য ধারণ করা যায়।

অ্যানড্রয়েড ফোনের অ্যাপগুলোর মাধ্যমে ইসলাম চর্চা অনেক সহজ হয়েছে। ইসলামবিষয়ক অ্যাপগুলোতে কোরআন, হাদিসের গ্রন্থ, ফাতাওয়ার কিতাব, নামাজের সময়সূচি, দৈনন্দিন জীবনের দোয়া, তাফসির, মাসআলা-মাসায়েল প্রভৃতি বিষয় আছে। অ্যানড্রয়েড ফোনের মাধ্যমে পিডিএফ, ইপাব, মোবি বিভিন্ন ফরম্যাটের পিডিএফ পড়া যায়। ইসলামের অসংখ্য বিষয়ে বর্তমানে পিডিএফ বিদ্যমান। এসব ধর্মীয় বই, অডিও, ভিডিও লেকচারগুলো অন্যের মাঝে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা যায়।