উৎপাদিত ডিম নিয়ে বিপাকে পড়েছে সিরাজগঞ্জের পোল্ট্রি খামারিরা।

0
21

সেলিম রেজা সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

খাদ্যের দাম বেশি ও চলমান লকডাউনের কারণে উৎপাদিত ডিম নিয়ে বিপাকে পড়েছে সিরাজগঞ্জের পোল্ট্রি খামারিরা। যানবাহন ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় ডিম বিক্রি করতে পারছে না ব্যবসায়ীরা। ফলে কম দামে বাধ্য হয়ে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে খামারিদের। এতে লোকসানে পড়েছেন তারা। হুমকির মুখে পড়েছে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি।
এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে শহরে ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে ডিম বিক্রির ব্যবস্থা নিলেও তা খুব একটা সুফল আসছে না। দেশের সম্ভাবনাময় এই পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচাতে সরকার মুরগির খাদ্যের দাম কমানোসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করবে এমনটিই প্রত্যাশা জেলার খামারিদের।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও খামারিরা জানায়, জেলায় তিন হাজার ৭৭৭টি পোল্ট্রি খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ডিম উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদিত ডিম জেলার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীসহ দেশের অনেক জেলাতে সরবরাহ করা হয়।
বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আসেন সিরাজগঞ্জে ডিম কিনতে। বর্তমানে মুরগির খাদ্যের দাম বেশি হওয়ার পাশাপাশি চলমান লকডাউনের কারণে দোকারপাট ও যানবাহনের অভাবে প্রতিদিন উৎপাদিত ডিম বিক্রি করতে পারছেন না খামারিরা। খামারিদের সহায়তা করতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ ভ্রাম্যমাণ ডিম বিক্রয় কেন্দ্র চালু করলেও তাতেও খুব একটা সুফল আসছে না।
খামারিদের মতে, ১০ লাখ ডিম উৎপাদিত হলেও এই জেলার চাহিদা মাত্র দুই লাখ। বাকি আট লাখ ডিম কোনোভাবেই অন্যত্র পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার, নিরাপদ প্রাণিজ পুষ্টি হবে সবার। এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে দেশে করোনা পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাণিজ পুষ্টি নিশ্চিত করতে গত ৯ এপ্রিল থেকে সিরাজগঞ্জে ন্যায্যমূল্যে ভ্রাম্যমাণ ডিম বিক্রয় কেন্দ্রর ব্যবস্থা করেছেন প্রাণিসম্পদ বিভাগ। কিন্তু সাধারণ মানুষের চলাচল আর দোকানপাট বন্ধ থাকায় ডিম বিক্রি করতে পারছে না ন্যায্যমূল্যের এই ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর পদকপ্রাপ্ত খামারি মাহফুজ উর রহমান বলেন, লকডাউনের কারণে খামারিদের খুব জটিল অবস্থা। ডিমের বাজার নাই বললেই চলে। ডিমের বাজারে লোকসান গুণছে খামারিরা। জেলার শিয়ালকোল ইউনিয়ন পোল্ট্রি খামারের প্রাণকেন্দ্র। শুধু শিয়ালকোল ইউনিয়নে প্রতিদিন দেড় লাখ ডিম উৎপাদন হয়। এর অর্ধেক বেশি ডিম বিক্রি হলেও বাকি ডিম খামারে থেকে যাচ্ছে। গরমের কারণে অনেক ডিম পচে যাচ্ছে। যে কারণে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে। এই লকডাউনের কারণে মুরগির খাদ্যের দাম বেশি। প্রতিটি ডিম উৎপাদন খরচ পাঁচ টাকা পঞ্চাশ পয়সা থেকে ছয় টাকা। বিক্রি করতে হচ্ছে ছয় টাকার কমে। ভোক্তাদের দ্বারে দ্বারে ডিম পৌঁছানোর জন্য সরকারিভাবে ডিম বিক্রির জন্য পিকআপ ভ্যান গাড়ি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না দিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ ডিম বিক্রি করা হচ্ছে। শিয়ালকোল ইউনিয়নে প্রতিদিন ডিম উৎপাদিত হয় দেড় লাখ পিস। ডিম বিক্রির জন্য শিয়ালকোলে একটি অটোরিকশা দেওয়া হয়েছে। এই অটোরিকশা প্রতিদিন চার থেকে সাড়ে চার হাজার ডিম বিক্রি করতে পারে। তাহলে বাকি ডিম কিভাবে বিক্রি করবে?
শ্যামপুর গ্রামের খামারি সাজিদুল ইসলাম বলেন, আমার খামারে প্রতিদিন আট হাজার ডিম উৎপাদিত হয়। মুরগির খাদ্যের দাম অনেক বেশি। ডিম বিক্রি করতে না পারলেও মুরগিকে খাবার দিতে হয় সময়মতো। সরকার মুরগির খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলে খামারিরা লোকসানের হাত থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে। তা না হলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে খামার। বেকার হয়ে পড়বে শত শত শ্রমিক।
ক্ষুদ্র শিয়ালকোল গ্রামের খামারি ও ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা বলেন, লকডাউনের কারণে ডিমের বাজার অনেকাংশে কম। আগের চাইতে ডিম প্রতি তিন টাকা কমে গেছে। করোনার কারণে বাইরে থেকে এলসির মাল আসা বন্ধ রয়েছে। কাঁচামালের দাম ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশি দামে খাদ্য কিনে ডিমপ্রতি এক থেকে দুই টাকা লোকসান হচ্ছে। তিন মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে ফিডে তিনশ টাকা দাম বেড়েছে। এই খাদ্যের দাম যদি কমাতে পারে তাহলে এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আক্তারুজ্জামান ভূইয়া বলেন, ‘সিরাজগঞ্জের উৎপাদিত ডিম রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে পাঠানো যায় তার জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যম মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে খামারিরা যাতে লোকসানে না পড়ে সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে। বর্তমানে লকডাউন ও করোনার কারণে জেলার খামারিরা উৎপাদিত ডিম নিয়ে যাতে সমস্যায় না হয়। সে কারণে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সারা দেশের মতো সিরাজগঞ্জ জেলা ও উপজেলা সদরগুলোতে ভ্রাম্যমাণ ভ্যানের মাধ্যমে ডিম বিক্রয় করা হচ্ছে। ফার্মের মুরগির ডিম ২৬ টাকা হালি, সোনালি মুরগির মাংস প্রতিকেজি ২৫০ টাকা মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্র চালুর ফলে খামারিরা তাদের উৎপাদিত ডিম ও মুরগি অতি সহজে বিক্রি করতে পারবে।