advertisement

করোনায় মানুষের আয়বৈষম্য বেড়েছে

হাবিবুর রহমান সুজন

নীতি সংস্কারের মাধ্যমে সরকারকে আয়-পুনর্বণ্টনমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে

উন্নয়ন অভিযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বেশকিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকে আমাদের অগ্রগতি হয়েছে। যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাথাপিছু জাতীয় আয়, গড় আয়ু ও শিক্ষার হার। আবার হ্রাস পেয়েছে শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার। এছাড়া নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বা আয়বৈষম্যের ক্ষেত্রে সমাজের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী বৈষম্য বাড়ার কথা স্বীকার করে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন শিক্ষা ও ছোট উদ্যোক্তাদের সমস্যা দূর করার উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শও দিয়েছেন। করোনার প্রভাবে নতুন করে দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সরকার উদ্যোগ নিয়েছে, বরাদ্দও বাড়িয়েছে কিন্তু কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়া ও তথ্যস্বল্পতায় ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে আয় ও সম্পদবৈষম্যের রাশ টেনে ধরতে হবে।

অতিধনীদের সংখ্যা দ্রুতই বেড়ে চলেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল নিম্ন আয় ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে অনেকাংশেই পৌঁছাচ্ছে না বললে হয়তো ভুল হবে না, আর তাই বাড়ছে বৈষম্য। অর্থনীতির ‘চুইয়ে পড়া তত্ত্ব’, যার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়নের সুফল সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছার কথা, তা আসলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সেভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সময় মনে করা হয়, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে আয়বৈষম্য বাড়লেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সুষম বণ্টন হবে। ফলে ধীরে ধীরে কমবে বৈষম্য, অর্থনীতিতে যা ‘কুজনেট রেখা’ নামে পরিচিত। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনীতির এ তত্ত্ব বাস্তবে প্রায়োগিকতার বিচারে অনেক ক্ষেত্রেই খাটে না, তাই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্যের বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়বৈষম্যের পেছনে রয়েছে বহু কারণ। তবে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মূলত উচ্চ প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আর এ প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে এর গুণগত মান কিংবা সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থার দিকে তুলনামূলকভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কম। এছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে কাঠামোগত রূপান্তর হলেও তা কর্মসংস্থানমুখী উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পায়নের পরিবর্তে মূলত নিম্ন আয় ও অনানুষ্ঠানিক সেবা খাতের দিকেই ঘটেছে। আর শিল্পায়ন মূলত হয়েছে নিম্ন মজুরির শ্রমিকনির্ভর পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করে। ফলে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বহুমুখীকরণ সেভাবে হয়ে ওঠেনি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তেমন বাড়ছে না। একে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। প্রতি বছর যে পরিমাণ তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করেন, তাদের অধিকাংশ কাজ পাচ্ছেন না। এভাবে বেকারত্ব ক্রমেই বেড়ে চলেছে এবং এটা একটা গুরুতর সংকটে রূপ নিচ্ছে। করোনার কারণে সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। করোনার সময়ে মানুষের আয় কমেছে। দেশে আয়বৈষম্যও বেড়েছে। এখানে সমন্বয়ের উদ্যোগ জরুরি। অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিতে পড়েছে। যে কারণে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য খাতে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য সমস্যা মোকাবেলা করা দুরূহ কিন্তু অসম্ভব নয়।

দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, গণচীন, ভিয়েতনাম, কিউবা, ইসরায়েল ও শ্রীলংকায় রাষ্ট্র নানা রকম কার্যকর আয় পুনর্বণ্টন কার্যক্রম গ্রহণ ও সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জিনি সহগ বৃদ্ধিকে শ্লথ করতে সক্ষম হয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক বিশ্বে জিনি সহগ কমানোর ব্যাপারে কিউবা ছাড়া অন্য কোনো উন্নয়নশীল দেশকে তেমন একটা সাফল্য অর্জন করতে দেখা যাচ্ছে না। এ দেশগুলোর মধ্যে কিউবা, গণচীন ও ভিয়েতনাম এখনো নিজেদের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে দাবি করে, বাকি দেশগুলো পুঁজিবাদী অর্থনীতির অনুসারী হয়েও শক্তিশালী বৈষম্য নিরসন নীতিমালা গ্রহণ করে চলেছে। ওপরের বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশে সফল ভূমি সংস্কার এবং/অথবা কৃষি সংস্কার নীতিমালা বাস্তবায়ন হয়েছে। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির মতো ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রগুলোর নীতি অনেক বেশি আয় পুনর্বণ্টনমূলক, যেখানে অন্তত প্রগতিশীল আয়কর ও সম্পত্তি করের মতো প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে জিডিপির ৩০-৩৫ শতাংশ সরকারি রাজস্ব হিসেবে সংগ্রহ করে ওই রাজস্ব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ উন্নয়ন, নিম্নবিত্ত পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, গণপরিবহন, বেকার ভাতা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হয়। আয়বৈষম্য হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার সরকার আশির দশকের শুরুতে প্রান্তিক মালয়ে গোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডে আয়বৈষম্য যখন ক্রমে বড় হচ্ছে তখন তারা নীতি কাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যেমন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় এবং নিশ্চিত করা হয় যেন সত্যিকারের ভুক্তভোগী ব্যক্তির কাছে সুবিধাগুলো পৌঁছে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে তালিকা করে কর্মসূচির প্রতিটি ধাপ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়।

আয়বৈষম্যের লাগাম টেনে ধরতে চাইলে ‘বাজার ব্যর্থতা’ কেন হয়, তা ভালোভাবে বুঝে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে। বাজার ব্যর্থ হয় গরিবের মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, ব্যর্থ হয় পরিবেশ দূষণের মতো নেতিবাচক বাহ্যিকতাগুলো ঠেকাতে, ব্যর্থ হয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তোলায়, ব্যর্থ হয় নানা রকম মনোপলি ও অলিগোপলির কারণে, ব্যর্থ হয় গণদ্রব্য বা ‘পাবলিক গুডস’ জোগান দিতে। মূলকথা হলো, রাষ্ট্রকে বৈষম্য নিরসনকারীর ভূমিকা নিতে হবে, যে রকম করা হয়েছে ভিয়েতনামে, গণচীনে কিংবা ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রগুলোয়। সরকারকে রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে প্রধানত সমাজের উচ্চ মধ্যবিত্তদের আয়কর ও সম্পত্তি কর থেকে। সরকারি ব্যয়ে প্রধান অগ্রাধিকার দিতে হবে বৈষম্যহীন ও মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষায়, গরিবের জন্য ভালো মানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলায়, মানসম্পন্ন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে, গরিবের খাদ্যনিরাপত্তা বিধানে।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে কভিড-১৯। করোনার কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফলে বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের ৮৫ শতাংশের অনেকেরই আয় বা মুনাফা কমেছে, অনেকে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন, আবার অনেকে কাজ হারিয়েছেন। কভিড-১৯-এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ফলে অনেকের অবস্থার উন্নতি হলেও অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো আয়ের পুনরুদ্ধার হয়নি। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতের সুনির্দিষ্ট আয়ের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিন্তু বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। আনুষ্ঠানিক খাতের কাজ তুলনামূলকভাবে উচ্চ আয়ের হওয়ায় করোনার ফলে আয়বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আয়বৈষম্য হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রয়োজন দ্বিমুখী নীতি—একদিকে যেমন দরকার উচ্চবিত্ত শ্রেণীর সম্পদের ক্ষেত্রে রাশ টানা, তেমনি প্রয়োজন নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থার পরিবর্তন। মনে রাখা প্রয়োজন দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য নেয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি বৈষম্য কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে করনীতি সংস্কারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আয়বৈষম্য কমাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হয়তো প্রগতিশীল (প্রগ্রেসিভ) কর ব্যবস্থা। সেক্ষেত্রে সরাসরি কর, অর্থাৎ আয়করের আওতায় করযোগ্য সবাইকে আনতে হবে আর করনীতি হতে হবে বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে। পাশাপাশি সম্পদ করের সঠিক বাস্তবায়ন হওয়াও জরুরি। কর ব্যবস্থার পাশাপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়াদের অবস্থার উন্নয়নে দরকার বহুমুখী প্রয়াস। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছে দিতে হলে প্রয়োজন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং শোভন কাজের ব্যবস্থা করা, যাতে সঠিক মজুরি ও সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের অবস্থার পরিবর্তন এবং প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়। বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যাপক সংস্কার। সে পরিপ্রেক্ষিতে হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি মাথাপিছু বরাদ্দে ব্যাপক পরিবর্তন আনা দরকার। পাশাপাশি শহরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জন্য নতুন নতুন কর্মসূচি ও জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।

সরকার যে দারিদ্র্য বিমোচনে তত্পর, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও অর্থনীতির ক্ষেত্রগুলোয় উন্নতির ধারা অব্যাহত রয়েছে। জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিসহ কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, বাণিজ্য, বৈদেশিক আয় ইত্যাদি খাতেও ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। মানুষের সচেতনতাও বেড়েছে আগের তুলনায়। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে হাঁটছে দেশ। আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করি, এই অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি জরুরি হচ্ছে বৈষম্য কমাতে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। বৈষম্য বিলোপ সম্ভব হলেই মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির শতভাগ সুফল দেশবাসী পেতে পারে, যা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই।

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -spot_img

সর্বাধিক পঠিত