কুরবানি’-আল্লাহর মেহমানদারী

0
9

পীরজাদা মুহাম্মদ এমদাদুল্লাহ শাজলী

কুরবান আরবী শব্দ হতে কুরবানীর উৎপত্তি। যার অর্থ উৎসর্গ, উপঢৌকন, সান্নিধ্য লাভের উপায় ইত্যাদি। পয়গাম্বর হযরত ইব্রাহিম (আঃ) স্বীয় পুত্র ইসমাইল (আঃ) কে আল্লাহর হুকুমে মীনা প্রান্তরে জবেহ করার যে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন আজকের দুনিয়ায় তা কুরবানী নামে খ্যাত। আল্লাহর সান্নিধ্য প্রাপ্ত মহাপুরুষদের সঙ্গে আল্লাহর মোয়ামালা যেমন হয়, সাধারণ মানুষদের সঙ্গে তেমন হয়না। মহা পুরুষগণকে কঠিন থেকে কঠিনতর ধাপ সমূহ অতিক্রম করতে হয়। প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর জন্য প্রাণ সোপর্দ করে দেয়া, আত্মসমর্পন, আল্লাহর আদেশের উপর সম্মতি ও সন্তুষ্টির পরিচয় দিতে হয়। আল্লাহর প্রেরিত অসংখ্য নবী-রাসুলগনের মধ্যে ইব্রাহিম (আঃ) যেহেতু উচ্চ মর্যাদাশালী পয়গাম্বর ছিলেন, তাই তাঁর পরীক্ষাও হয়েছে কঠিন থেকে কঠিনতর। প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি উচ্চতর মর্যাদার সঙ্গে কামিয়াব হয়ে উত্তম পুরস্কারে ভুষিত হয়েছিলেন। স্বীয় পুত্রকে কুরবানী করার পরীক্ষা ছিল অধিকতর পিত্ত বিগলনকারী ও হৃদয় বিদারক পরীক্ষা।

ইব্রাহিম (আঃ) নিঃসন্তান ছিলেন। তাই প্রভুর দরগাহে ফরিয়াদ করেছিলেন- ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এক সৎকর্ম পরায়ন সন্তান দান করুন। তারপর আমি তাকে এক ধৈর্যশীল পূত্রের সু-সংবাদ দিলাম’। (সুরা সাফফাত, আয়াত-১০০)

হযরত ইব্রাহিম ও বিবি হাজেরাকে যখন ইসমাইলের (আঃ) জন্মের সু-সংবাদ দেয়া হলো- তখন ইব্রাহিম (আঃ) এর বয়স ছিল ৮৬ মতান্তরে ৯০ মতান্তরে-৯৯ বছর। জীবনের পরন্ত বয়সে বৃদ্ধাবস্থায় পাওয়া সন্তান যখন হাটা-চলা, দৌড়া-দৌড়ি, কথা বলার উপযুক্ত হলো- পিতা- মাতার অন্তরে সন্তানের প্রেম ভালবাসা গভীর থেকে গভীরে জায়গা করে নিল তখন শুরু হলো ইব্রাহিমের (আঃ) প্রেমের পরীক্ষা। এক অন্তরে দুইজনার প্রেম রাখা যায়না। ইব্রাহিমী অন্তরে মাওলার প্রেমের ঢেউ উত্তাল, নাকি সন্তানের ভালবাসা প্রবল, তা পরীক্ষা করার জন্য নিজ হস্তে স্বীয়পুত্র ইসমাইলকে (আঃ) কুরবানীর আদেশ জারী করা হলো। ‘কুরবানীর প্রজ্ঞাপন জারী করা যতটা না দেরী- আত্ম সমর্পন তাঁর চেয়েও তাড়াতাড়ি’। পিতা- পুত্র আল্লাহ্র হুকুমের কাছে আত্ম সমর্পন করে দিলেন। আরবের মক্কা নগরীর অদূরে ‘মীনা প্রান্তরে’ ধারালো ছুড়ি দিয়ে পিতা পুত্রকে কুরবানী করা শুরু করলেন। প্রভূর প্রেমের পরীক্ষায় ইব্রাহিম (আঃ) উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ মাকাম প্রাপ্ত ‘খালিলুল্লাহ’ উপাধীতে ভূষিত হলেন। ধৈর্যের পরীক্ষায় কামিয়াব হয়ে ছোট বালক ইসমাইল (আঃ) ‘যবিহুল্লাহ’ বা আল্লাহর কুরবানীতে ভূষিত হলেন।

আল্লাহ বলেন- ‘যখন তারা উভয়ে (পিতা-পুত্র) সম্মত হয়ে আত্ম সমর্পন করলেন- এবং পুত্রকে উপুড় করে শোয়ালেন। তখন আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম- হে-ইব্রাহিম! তুমি সত্যিই স্বপ্নাদেশ বাস্তবায়ন করেছো। এভাবেই আমি সৎকর্ম পরায়ন দিগকে পুরস্কৃত করে থাকি’ (সূরা সাফফাত, আয়াত-১০৩-১০৫)। ইব্রাহিম (আঃ) যখন শিশু পুত্র ইসমাইলকে কুরবানী করার জন্য গলায় ছুড়ি চালালেন- প্রেমের পরীক্ষায় কামিয়াব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বেহেশ্ত হতে বিরাট এক দুম্বা প্রেরণ করে তা জবেহ করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর ইব্রাহিম (আঃ) বেহেস্তী দুম্বা কুরবানী করে মাওলায়ে কারীমের ইচ্ছা পূরণ করলেন। আল্লাহ বলেন ‘আমি তাকে (ইসমাইলকে) মুক্ত করলাম বিরাট এক কুরবানীর বিনীময়ে’। (সূরা সাফফাত আয়াত-১০৭)

দয়ার সাগর, মায়ার পাগল, করুনার আধাঁর মহান আল্লাহ যদি সে দিন মীনা প্রান্তরে কুরবানীর জন্য বেহেস্তী দুম্বা না পাঠাতেন তাহলে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত কলিজার টুকরা, নাড়ি ছেড়া ধন, পিতার ছুরিতে জবেহ হওয়ার ‘সিলসিলা চালু হয়ে যেতো, এমন কঠিন ঈমানী পরীক্ষায় আমরা কয়জন উত্তীর্ণ হতে পারতাম? যিনি এমন এহসান বখশিশ করেছেন সে মহান সত্তার নাম আল্লাহ, আল্লাহ, আল্লাহ! মীনা প্রান্তরে ইব্রাহিমের (আঃ) ছুরিতে ইসমাইলের (আঃ) পরিবর্তে বেহেস্তী দুম্বা জব্হে হওয়ার যে সিলসিলা চালু হয়েছে একেই বলে কুরবানী। কিয়ামত পর্যন্ত যত হাজী সাহেবগন পবিত্র হাজ্ব করার জন্য মক্কা নগরীতে সমবেত হবেন তাদের জন্য মীনাতে কুরবানী করা ইবাদতে শামিল করা হয়েছে। সামর্থবান মুসলিম মিল্লাতের জন্য কুরবানীকে করা হয়েছে ওয়াজিব। অসামর্থবানদের জন্য ধনী ব্যক্তির কুরবানীতে রাখা হয়েছে অধিকার। ধনী গরীবের এ অনুষ্ঠানকে বলে ‘যিয়াফাতুল্লাহ’ বা আল্লাহর মেহমানদারী। আল্লাহর মেহমানদারী করার জন্য যে কুরবানী করা হয় তার সব বানী আদমই ভোগ করেন। আল্লাহ কেবল বান্দার অন্তরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর নিকট পৌছায় না উহাদের গোস্ত এবং রক্ত, বরং পৌছায় তোমাদের তাকওয়া’। সূরা হাজ্জ্ব আয়াত- ৩৭।

তাকওয়াপূর্ণ কুরবানী ইব্রাহিমী সিলসিলায় কবুল করার জন্য মহান আল্লাহ্ অপেক্ষা করে বসে থাকেন। সুবহানাল্লাহ! এমন কুরবানীর রক্ত গলা হতে বের হয়ে মাটিতে পড়ার পূর্বেই আল্লাহ্ তা কবুল করে নেন। অন্যদিকে তাকওয়া বিহীন কুরবানীর আয়োজন আল্লাহর নিঃপ্রয়োজন। তাকওয়াপূর্ণ কুরবানী এবং আল্লাহর মেহমান দারীর সদস্য হওয়ার জন্য ঈদুল আযহার নামাজের মাধ্যমে কুরবানীর পূর্বেই বান্দার জীবন হতে কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, মিথ্যা, গীবত, কৃপনতা, বিদ্বেষ, রিয়া, অহংকার, ঘুষ, সুদ, হারাম তথা কুকুর ও শয়তানি স্বভাব গুলো বর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে ধৈর্য, শুকুর, সত্যবাদীতা, পরোপকার, অল্পেতু’ি, জ্ঞান অর্জন, দৃঢ় বিশ্বাস, তফবীজ, তাওয়াক্কুল, রেযা, তাসলমি তথা নবী রাসূল, ছিদ্দিক ও শহীদগণের স্বভাব গুলো অর্জন করতে হবে। মনের পশুত্বকে জবাই করে যদি আমরা তাকওয়াপূর্ণ কুরবানী করতে পারি, তাহলে ‘একদিকে মনের পশুত্ব বিলীন হবে অন্যদিকে বনের পশুর কুরবানী কবুল হবে’। পরিশেষে মুনিবের নিকট গোলামের একান্ত ফরিয়াদ ও আর্তি হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের অপরাধ গুলো মার্জনা করে তোমার হাবিবের (সা:) তোফায়েলে আমাদের কুরবানীর ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্র তম আয়োজনকে ইব্রাহিমী সিলসিলায় কবুল করুন। আমিন!!