চিলমারীতে নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছে ব্যারাক হাউজ বিশিষ্ট আশ্রায়ন কেন্দ্রের আশ্রিতরা

0
15

মোঃ মিজানুর রহমান
কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ

কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রিতদের অধিকার- শেখ হাসিনার অঙ্গীকার সামনে রেখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কতৃর্ক নির্মিত চর ফেচকা বাবদ হাতিয়া বকসী আশ্রয়ন প্রকল্পের কয়েকটি ব্যারাকে ধ্ব¦স দেখা দিয়েছে। ফাটল ধরছে তিনটি ব্যারাকের ১৫টি কক্ষে। ঘরের নিচ থেকে বৃষ্টির পানিতে বালু সরে যাওয়ায় দেবে যাচ্ছে একটি ব্যারাক। সামান্য বাতাসে টিন উড়ে গেছে একটি কক্ষের। যে কোন মহূর্তে ব্যারাকের ঘর গুলি ভেঙ্গে পড়ার আশংকায় নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছে আশ্রয়নে আশ্রয় নেয় ৪৮টি ব্যারাকের ২৪০টি পরিবার।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় আশ্রয়ন প্রকল্পের ১৮ নং ব্যারাকের একটি ঘর সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙ্গে গেছে। ভেঙ্গে গেছে আশ্রিতদের ব্যবহারের টয়লেট। টিউবয়েল নেই। ১৭ নং ব্যারাকের প্রথম কক্ষের চালের টিন বাতাসে উড়ছে। ১৬ নং ব্যারাকটির সামন ও পিছন দু পাশ দিয়ে বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ায় ব্যারাকের নিচের মাটি সরে গিয়ে বিরাট ২টি ড্রেনের বা খন্দের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যারাকটি বর্তমানে ধীরে ধীরে দেবে যাচ্ছে। যে কোন মহূর্তে ধ্বসে পড়তে পারে পুরো ব্যারাক ভবনটি।

ধ্বসে যাওয়া ১৮ নং ব্যারাকের পাশের ব্যারাকের একদম শেষ প্রান্তের কক্ষে বসবাস করেন মোজাফ্ফর হোসেন (৫৫)। তিনি এ প্রতিনিধির সাথে আলাপচারিতায় বলেন “ এক বিদুয়্যা বেটি ছাওয়া ভাঙ্গি যাওয়া ঘরটাত একায় থাকছিল। বৃষ্টির পানিত ঘরটা যেলা ভাঙ্গি গেইল, তার পাছে অন্য আরেকটা খালি ঘরত যায়্যা উঠতে তাঁই। তিনি আরও বলেন, ঘরের কাম হালকা হইছে। বালুর ভাগ বেশি সিমেন্টের ভাগ কম। পানি দেয় নাই (কিউরিং এর জন্য পানি ব্যবহার করেনি) । বৃষ্টির পানি নামি যাওয়ার জন্যে যদি নালা করিয়া পাইপ লাগেয়া দিলে হয় , তাইলে ভাঙ্গিল না হয়। ১৭ নং ব্যারাকের ঘরটা সামাইন্য বাতাস নাগিয়া টিন উড়ি গেইছে। এই গেল চৈত্রী মাসে এটা উড়ি গেইছে। ইউএনও সাহেব কয়দিন আগত সউগ দেকি গেইছে। তারপাছে সংবাদিক আসছিল। ইউএনও সাহেব এইদোন কোন কতা কয়্যা যায় নাই যে,এতোদিনের মইদ্যে সউগ ঠিক করি দেমো। তাঁই আইসচে দেকি গেইছে, এই মাত্র।”

৩১ নং ব্যারাকের বাসিন্দা সাহের আলী, পিতা মৃত নছদ্দি এ প্রতিনিধিকে বলেন, “ ঘরের দুয়্যার থাকি সিমেন্ট ভাঙ্গি পরে। খুব জোড়ে বাতাস আইসলে ঘর থর থর করি কাঁপে। ঘরোত তো ঢোকা-বেড়া করা নাগে। হঠাৎ বাতাসত যদি ভাঙ্গি পরে ? খুব ভয় নাগে ঘরত থাইকতে। দরজাত কাঁইও ধাক্কা দিলে কহন ব্যান ঘর ভাঙ্গি যায় সেই চিন্তায় ঠিক মতো নিন্দও পাইরব্যার পারিনা।”্ একই রকম কথা বলেছেন কোব্বাত আলীর স্ত্রী ছুপিয়া (৪৭)। তিনি বলেন, ঘর গুল্যার সমস্যা বালু বেশি করি দিছে সিমেন্ট দিছে কম করি। নাই একনা বাতাস আইসলে, ঘর খালি ধর ধর করি কাঁপিয়া, হুরমুর করি পইরব্যার ধরে। ছাওয়া-পাওয়া নিয়া থাইকপ্যার পাইনা। বালু খসিয়া পরে। জীবনের ভয়তো হয়?৭৫ নং ব্যারাকের বাসিন্দা আব্দুল আউয়ালের পুত্র হাবিবুর রহমান তার উক্ত আশ্রয়ন কেন্দ্রে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ঘর গুলা ভাঙ্গি যাওয়ার কারণ হইলো, মাঠ কোনার উত্তর দিকে উঁচা আর দক্ষিণ দিকে দোলা কইরচে। বৃষ্টি আইসলে সম্পূর্ণ পানি দক্ষিণ দিক দিয়া নামি যায়। যার কারণে বালু সরি যায় , ঘরও ভাঙ্গি যায়। রুমের কাজও তো হয় নাই। ১২টা ১৪টা বালুর সাথে একটা করি সিমেন্ট দিছে। দেওয়ার পরে কাজ কইরচে। হালকা একনা বাড়ি দিলে, সউগ ভাঙ্গি পরে। কাম যহন হয় ,তহন আমি নিজ চোখে দেখছি। আমার বাড়ি এইখানে, নয়ারহাট ইউনিয়নে। সেনা বাহিনী কাজের সময় হামাক এ্যাডে চাইপপ্যারও দেয় নাই। ”

আশ্রয়নের বাসিন্দা মোশারফ (৪৫), ফজলুল হক (৫০), সামেদ আলী (৫২) কহিনুর ( ৩৫), সালেহা ( ৪০) সহ আরো অনেকে একই ধরনের কথা বলেছেন। ফজলুল হক (৬০) বলেন, চাইর আঙ্গুল করি খাড়ায় রডের মদ্যে ঘর গুলাত টিন ডাংগে দিছে। রড যদি একনা বেশি বড় করি দিয়া টিন ডাঙ্গাইল হয়, তাইলে আর বাতাসে খুলি নিব্যার ,না পারিল হয়।

আশ্রয়ন বাসীদের সকলের অভিযোগ একই, অভিজ্ঞতাও একই রকম। তারা ইটের ঘরে থাকলেও শান্তিতে থাকতে পাচ্ছেন না। থাকতে পাচ্ছেন না নিরাপদে। রাত্রীতে একটু বাতাস ঘরে লাগলেই ঘুম ভেঙ্গে যায় তাদের। ঘর ভেঙ্গে পড়ার ভয়ে তারা দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে আসেন। কখনও কখনও নিদ্রাহীন ভাবে তাদের রাত কাটে। এই সকল বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “ ইয়্যার চায়্যা সিঁড়ি নাগেয়া যদি টিন দিয়া ঘিরি দিলে হয়, সেটায় ভালো হইলে হয়। অথবা খেড়ি ঘরের ছাপড়া-টাপরা দিলে হয় ,তাইলেও শান্তিত থাকনু হয়। কহন যে ঘর ভাঙ্গি পরে কাঁই জানে? ঘরত ঢুকইে ভয় নাগে এলা।”

চিলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিস সূত্রে জানাগেছে, ২০১৯-২০২০ ইং অর্থ বছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর ৭২ পদাতিক ডিভিশন, পদাতিক ব্রিগেড ৩৪-ই বেংগল এবং ৩০ বীর এর তত্বাবধানে এই আশ্রয়ন প্রকল্পটির ব্যারাক নির্মিত হয়। উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের ১২.৮৪ একর জমির উপর ৯৭৪.০২০ মেট্রিকটন গম এবং পরিবহন খরচ ১৫০৪৩২০ টাকা ব্যয়ে মাটি ভড়াট করার পর সেনাবাহিনীর কাছে তা হস্তান্তর করা হয়। এরপর সেনা বাহিনী সেখানে ২৪০টি পরিবার থাকার জন্য ৪৮ টি ব্যারাক হাউজ নির্মাণ করেন। এর পিরবীতে কতটাকা বরাদ্ধ ছিল তা নির্বাহী অফিস জানাতে পরেনি। এটা নাকি শুধু যারা কাজ করেছে ,তারাই জানে।

ব্যারাক হাউজের ঘর ধসে পড়ার বিষয়টি নিয়ে চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাহবুবার রহমানের মুখোমুখি হলে তিনি জানান, গত ১০ই জুলাই তিনি আশ্রায়ন কেন্দ্রটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন,বৃষ্টির কারণে কিছু কিছু এলাকায় বালু মাটি সরে গেছে, ফলে কয়েকটি ব্যারাকের বাথরুম, গোসলখানা ও টয়লেট সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পরিদর্শন প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন এবং প্রাপ্ত নির্দেশনা মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।