জীবন-জীবিকার কতটা সুরক্ষা দেবে বাজেট

0
24

হাবিবুর রহমান সুজন

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হওয়ার চূড়ান্ত পরিক্রমায় রয়েছে। বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের এই উন্নয়নযাত্রার প্রতিফলন দেখা যাবে বাজেটের আকারেই। স্মরণ করা যেতে পারে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭৭৬ কোটি টাকা। বিপরীতে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উপস্থাপিত দেশের ৫০তম প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

যা জিডিপির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এই বাজেট একইসঙ্গে চলমান বৈশিক করোনাভাইরাস মহামারীকালে দেশের দ্বিতীয় বাজেট। সংগত কারণেই এই বাজেটে মহামারী মোকাবিলা এবং দেশের চলমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
মহামারীতে জীবন ও জীবিকার সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে এবার জাতীয় বাজেটে মোট ব্যয়বৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১২ শতাংশ। বাজেটে ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু দেখা যাচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.২ শতাংশ ধরা হলেও সেই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিনিয়োগ কীভাবে হবে তার কোনো প্রাক্কলন বাজেটে দৃশ্যমান নয়। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায় যে, বিশেষ কওে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে এক জায়গায় আটকে আছে। কভিড মহামারীতে তা আরও কমে গেছে। প্রশ্ন হলো, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ না হলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে কীভাবে? শুধু সরকারি বিনিয়োগ দিয়ে তো হবে না।

আবার মহামারীর এক বছরে সরকারের অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা গেছে। এই বাস্তবতার সঙ্গে প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ কীভাবে মিলবে সেটা নিয়ে ভাববার অবকাশ আছে বৈকি। অন্যদিকে, সাধারণভাবে একটা অর্থনীতিতে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা হলেও সেটা বিশেষ পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত হতে পারে। এক্ষেত্রে চিন্তার বিষয় ঘাটতির হার নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ঘাটতি অর্থায়ন কীভাবে হবে। যদি সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করা হয়, তাহলে আশঙ্কা কম। কিন্তু বেশি সুদের ঋণ নিলেই তা ভবিষ্যতে সংকট তৈরি করবে। যেমন সরকারি ব্যয়ে সবচেয়ে বড় খাত এখন সুদ পরিশোধ। বেশি সুদে ঋণ নিয়ে দায় যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ। অর্থাৎ শেষ বিচারে তা সাধারণ মানুষের কাঁধেই পড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণেরও পথ খুঁজতে হবে। এমতাবস্থায় ব্যাংক খাতে জমা হওয়া অলস তারল্যের বোঝা কমাতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত, বিশেষ করে আয় কমে যাওয়া এবং কাজ হারানো মানুষদের কীভাবে কাজ ফিরিয়ে দেওয়া যাবে সেটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। নানা জরিপ বলছে অন্তত ৬০ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বহু মানুষ। গত বছর মহামারীর শুরুর দিকেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত সোয়া লাখ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজগুলো মহামারীর প্রথম ঢেউ মোকাবিলায় অনেকটাই সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু এইসব প্রণোদনার ঋণ ছাড় ও বাস্তবায়ন করতে করতেই দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানে। অন্যদিকে, দেখা গেছে প্রণোদনা ঋণের বড় অংশই বড় উদ্যোক্তারা বেশি পেলেও ছোট উদ্যোক্তারা পেয়েছে কম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতের ভূমিকা বেশি হলেও এই খাতই সবচেয়ে অবহেলিত রয়ে গেছে। ব্যাংকঋণ ছাড় করাসহ যে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় এমনটা ঘটেছে তা কতটা দূর হলো সেটা এক জরুরি বিবেচনা।

মহামারীকালে সবচেয়ে বেশি দুর্দশা দেখা গেছে স্বাস্থ্য খাতে। বিগত অর্থবছরের বাজেটের মতো চলতি বাজেটেও স্বাস্থ্য খাতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু মহামারী মোকাবিলার চ্যালেঞ্জের সময়টাতেই স্বাস্থ্য খাতে যে মাত্রার দুর্নীতি দেখা গেছে এবারও তা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বরাদ্দ বাড়িয়ে লাভ কী হবে? এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের টিকাদানের মধ্য দিয়ে হার্ড ইমিউনিটির পথে এগিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে, প্রায় দেড় বছর ধরে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষা খাতে যে নজিরবিহীন অচলাবস্থা দেখা গেছে সেটা দূর করতে শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা খাতে আরও ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আগে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করতে হবে। সেটা করা সম্ভব হলেই মহামারীর অভিঘাত মোকাবিলা করে অর্থনীতির স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একইসঙ্গে এডিপি বাস্তবায়নের হার বাড়ানোর জন্য আমলাতন্ত্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কাক্সিক্ষত কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটার চিন্তা করতে হবে। নইলে আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সুফল পাওয়া যাবে না।