টাকার নাকি পাখা গজাইছে!

প্রভাষ আমিন

কয়েকদিন আগে গ্রাম থেকে আমারই এক বন্ধু এসেছিল অফিসে। গ্রামে তার মূল ব্যবসা হলো জমি কেনাবেচা। কথা প্রসঙ্গে সে জানালো, হঠাৎ করেই গ্রামে জমির দাম বেড়ে গেছে। এই দুর্দিনে জমির দাম বেড়ে যাওয়ার কথা শুনে আমি একটু অবাকই হলাম। সে ব্যাখ্যা করে জানালো, ভয়ে মানুষ ব্যাংকে রাখা টাকা তুলে ফেলছে। সেই টাকা দিয়ে সবাই জমি কিনছে।

মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ মনে করছে না। তারচেয়ে জমি অনেক নিরাপদ বিনিয়োগ। তাই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে জমি কিনছে আর তাতেই জমির দাম বেড়ে গেছে। প্রথমে তার কথা শুনে অবাক হলেও ব্যাখ্যা শুনে শঙ্কিত হলাম। গুজবের ডালপালা ছড়িয়েছে তৃণমূলেও, আমার শঙ্কার কারণ হলো এটাই।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি প্রবল চাপের মুখে আছে। বিশ্ব এখন একটা গ্রামের মতো। বিশ্বের কোনো এক কোনায় চাপ সৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়ে সবখানে। বাংলাদেশও সেই গ্রামের বাইরে নয়। তাই বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিও প্রবল চাপে পড়েছে।

করোনার ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি যখন আবার গতি পাচ্ছিল, তখনই যুদ্ধের দামামা শ্লথ করে দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও দ্রুত কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে শঙ্কা ভর করেছে সব মহলে।

বাংলাদেশের কিছু মানুষ আছে শকুনের মতো। তারা অপেক্ষা করে থাকে, কখন দুঃসময় আসবে। কখন পানি ঘোলা হবে, যাতে সেখানে মাছ শিকার করা যায়। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাচ্ছে, রিজার্ভ শূন্য হয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এই ভাবনা সবসময় তাদের মনে। তাদের অপেক্ষার শেষ নেই। কিন্তু অপেক্ষা আর ফুরায় না। বাংলাদেশও শ্রীলঙ্কা হয় না, রিজার্ভও শূন্য হয় না।

শকুনদের দোয়া পূরণ হয় না। অর্থনীতির গরুও মরে না। তবে এটা ঠিক বাংলাদেশের অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে চাপের মুখে আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সময় রিজার্ভ ছিল সিঙ্গেল ডিজিটে। সেই রিজার্ভ সরকার তুলেছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।
এখন নামতে নামতে তা ৩০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছে। দুঃসময়ে মানুষকে সাশ্রয়ী হতে হয়। কোনোরকমে নাক ভাসিয়ে টিকে থাকতে হয়। আর এই দুঃসময় কিন্তু সরকার লুকাচ্ছে না।

বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাচ্ছে, রিজার্ভ শূন্য হয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এই ভাবনা সবসময় তাদের মনে। তাদের অপেক্ষার শেষ নেই। কিন্তু অপেক্ষা আর ফুরায় না। বাংলাদেশও শ্রীলঙ্কা হয় না, রিজার্ভও শূন্য হয় না…
সরকার প্রধান বারবার সাশ্রয়ের কথা বলছেন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি ইঞ্চি জমিতে আবাদ করার কথা বলছেন। বিলাস সামগ্রী আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। শুধু মুখে সাশ্রয়ের কথা বলা নয়, কার্যকর সাশ্রয়ের জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।
কম প্রয়োজনীয় প্রকল্পে অর্থ ছাড় বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। রিজার্ভ সঙ্কটে জরুরি ছাড়া এলসি খুলতেও নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু সাশ্রয়ের আহ্বানে মানুষের মনে স্বস্তির বদলে শঙ্কা এসেছে।

মানুষের মনের এই শঙ্কাই কাজে লাগাচ্ছে সেই শকুন মানুষগুলো। ভয় পাওয়া মানুষকে ভয় দেখানো সহজ। তাই অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় থাকা মানুষকে আরও ভয় দেখিয়ে কাবু করার কৌশল নিয়েছে তারা। এই শকুন মানুষগুলো দেশে যেমন আছে, বিদেশেও আছে। তবে দেশে বসে গুজব ছড়ানো একটু কঠিন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভয় আছে। কিন্তু দেশের বাইরে বসে অনায়াসে গুজব ছড়ানো যায়।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অবাধ অপব্যবহার করা যায়। দেশের বাইরে থাকা কিছু শকুন মানুষ গুজব ছড়ায়, দেশের ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট আছে। ব্যাংকে গেলে টাকা পাওয়া যায় না। আর গুজবের একটা স্নোবল ইফেক্ট আছে। আপনি ছোট্ট একটা স্নোবল ওপর থেকে ছেড়ে দিন। সেটা নিচে নামতে নামতে বিশাল আকার ধারণ করে। তেমনি গুজবের নামে ছোট্ট কোনো খবর ছড়ায় বাতাসের গতিতে। আর প্রত্যেকবার সেই গুজবে যুক্ত হয় নতুন নতুন উপাদান।

কারো সন্তান কালো হয়েছে, এই খবর ১০ কান ঘুরে হয়—অমুকের পেট থেকে কাকের বাচ্চা হচ্ছে আর উড়ে যাচ্ছে। তাই ব্যাংকে তারল্যের সঙ্কট—এই গুজব দ্রুত ব্যাংক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া পর্যন্ত চলে গেছে। আর গুজবের প্রথম ধাক্কায় মানুষ ব্যাংক থেকে তুলে নেয় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

উদ্যোক্তাদেরও পুঁজি দিতে হয় বটে, তবে ব্যাংক ব্যবস্থার মূল পুঁজি হলো আস্থা। মানুষ ভরসা করে ব্যাংকে টাকা রাখে। আর ব্যাংকও মানুষের আমানতের টাকায় অন্যকে ঋণ দেয়, বিনিয়োগ করে। আমানতের সুদের চেয়ে ঋণের সুদ বেশি। এটাই ব্যাংকের প্রাথমিক লাভ।

সমস্যা হয়, যখন কেউ ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়, তখন। তবে খেলাপি ঋণও এখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। তবে একজন ঋণ নিয়ে ফেরত না দিলেই যে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে, ব্যাপারটা অত সহজও নয়। কারণ ব্যাংকে অনেকের টাকা থাকে।

বলা হয়, টাকা যত ঘুরবে, তত বাড়বে। সমস্যা হয়, যখন অনেক আমানতকারী একসাথে ফেরত চাইবেন, তখন। আমানতের টাকা তো ব্যাংক ফেলে রাখে না। ঋণ দেয় বা বিনিয়োগ করে। কিন্তু একসাথে যদি সব আমানতকারী বা অনেক আমানতকারী টাকা ফেরত চান, তখন বিশ্বের যত বড় ব্যাংক হোক, বিপাকে পড়বেই। এই সুযোগটাই নিয়েছিল, সেই শকুন মানুষগুলো।

ভয় পাওয়া মানুষকে ভয় দেখানো সহজ। তাই অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় থাকা মানুষকে আরও ভয় দেখিয়ে কাবু করার কৌশল নিয়েছে তারা…
প্রথম ধাক্কায় ৫০ হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া, তারই প্রমাণ। তবে আশার কথা হলো, সরকারের নানা দৃশ্যমান উদ্যোগে মানুষের আস্থা ফিরেছে। তাই ব্যাংকে টাকাও ফিরে আসছে। গুজব দিয়েও ব্যাংক ব্যবস্থায় ধস নামানো যায়নি।

তবে বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা যে একেবারে ভালো আছে, তেমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। অনেকরকমের ছাড় দিয়েও বাংলাদেশে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এই দুঃসময়েও ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে বিভিন্ন হাওয়াই কোম্পানি।

ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার এই অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে না পারলে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমতেই থাকবে, আর ব্যাংকও ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে যাবে। ব্যাংক ব্যবস্থা এখনও টাকা রাখার জন্য নিরাপদ, তবে লাভজনক নয়। কয়েকদিন আগে এক ব্যাংকে গিয়েছিলাম ডিপিএস করার জন্য। এক বন্ধু ব্যাংকার আমাকে নিরুৎসাহিত করলেন। হিসাব করে দেখিয়ে দিলেন, মুদ্রাস্ফীতি হিসেবে নিলে শেষ পর্যন্ত লাভ হয় না। শুধু ডিপিএস নয়, বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পে সুদের হার আর মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করলে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকে রাখা টাকা কমে যায়।

দলে দলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে জমি কেনা বা সিন্দুকে টাকা রাখা নিরাপদ নয়। শেষ পর্যন্ত আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থাতেই আস্থা রাখতে হবে। তবে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করতে ব্যাংক ব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রভাষ আমিন ।। বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

এই ওয়েবসাইটের সকল লেখার দায়ভার লেখকের নিজের, স্বাধীন নিউজ কতৃপক্ষ প্রকাশিত লেখার দায়ভার বহন করে না।
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -