advertisement

টানা ৭০ বছর ব্রিজে বসে ভিক্ষাবৃত্তি, নাম পেয়েছে ‘ফকিরাপুল’

আবুল হাসনাত মো. রাফি | ব্রাহ্মণবাড়িয়া |

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে একটি খাল। এটি ‘টাউন খাল’ নামেই পরিচিত। জেলা শহরকে উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করেছে খালটি। জেলা শহরের প্রধান সড়ক টিএ রোডে এই খালের ওপর বর্তমানে দুটি সেতু পাশাপাশি রয়েছে। এরমধ্যে একটি সেতু দীর্ঘদিনের পুরোনো, অপরটি নির্মিত হয়েছে আট থেকে নয় বছর আগে।

তবে পুরোনো সেতুটি ঠিক কতদিন আগে নির্মাণ করা হয়েছে সে তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা যায়, সেতুটির বয়স অন্তত ৭০ বছর। কখনও সেতুটি দিয়ে গেলে দেখা যাবে, এর দুই দিকে ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন ফকির-মিসকিনরা। তারা সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বসে থাকেন সাহায্যের আশায়। আর এ কারণেই নাকি সেতুটি পরিচিতি পেয়েছেন ‘ফকিরাপুল’ নামে।

প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সেতুর ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে ভিক্ষা করতে বসেন প্রায় অর্ধশতাধিক ফকির-মিসকিন। শবে বরাত বা বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিনে এই সিরিয়াল বেড়ে সড়কের দুইপাশে প্রায় পাঁচ থেকে সাত শতাধিক ব্যক্তিতে দাঁড়ায়। এসময় অনেককে এখানকার ফকির-মিসকিনদের মধ্যে নগদ টাকা, মানতের মুরগি-খাসি বা রান্না করা খাবার পরিবেশন করতে দেখা যায়। অনেকে বিশেষ দিনে তাদের দাওয়াত করে বাড়িতে নিয়ে যান। এক্ষেত্রে তাদের গাড়ি ভাড়া অগ্রিম দিয়ে যেতে হয়। তাদের মধ্যে অনেকে আবার নির্দিষ্ট পদ ছাড়া খাবার গ্রহণ করেন না। এই সেতুতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তি করছেন এমন ব্যক্তিও রয়েছেন।

জেলা শহরের বেশ কয়েকজন প্রবীণ নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সেতু এলাকায় একসময ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি রাখা হতো। এখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় ঘোড়ার গাড়িযোগে যাতায়াত করতো মানুষ। সেতুটি নির্মাণের পরে এলাকাটি ‘ঘোড়াপট্রি ব্রিজ’ নামে পরিচিতি পায়। পরে বিভিন্ন স্থান থেকে সেতুটিতে ফকির-মিসকিনদের আগমন শুরু হয়। এরপর থেকে এটি ‘ফকিরাপুল’ নামেই পরিচিত।

লাল বানু নামের এক অন্ধ ভিক্ষুক জানান, তার বাড়ি সরাইল উপজেলার অরুয়াইলে। সংগ্রামের (মুক্তিযুদ্ধের) এক বছর পর এই শহরে আসেন তিনি। গত ৪০ বছর ধরে এই সেতুতে ভিক্ষা করছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমার মতো আরও ছয়জন অন্ধ এই সেতুতে বসেন। এছাড়া এখন মাদকসেবীরাও এসে ভিক্ষা করেন বলে জানান তিনি।

গাজীপুর জেলা থেকে আসা হাসান সরদার নামের একজন বলেন, ‘আমার বাড়িঘর নেই। ৩০ বছর ধরে এই সেতুতে বসছি। সাহায্যের আশায় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এখানে বসে থাকি। অনেক দিন পাই, আবার অনেক দিন কিছুই পাই না।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনের সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মনজুরুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, সেতুটি নির্মিত হওয়ার আগে এখানে বাঁশের সাঁকো ছিল। এরপর মানুষের চলাচলের জন্য কাঠের একটি সেতু তৈরি করা হয়। বর্তমান সেতুটির বয়স সঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে সেতুটি নির্মাণের ঠিকাদার শহরের মনিদ্র সাহা ছিলেন বলে জেনেছি।’

তিনি বলেন, ‘সেতুটি নির্মাণের আগে এতবড় ঢালাইয়ের সেতু অত্র এলাকায় নির্মিত হয়নি। এর আগে লোহার সেতুর প্রচলন ছিল। তিনি (মনিদ্র সাহা) সেতুটি নির্মাণের পর আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ উনাকে দেখতে আসতেন। আমার বয়স প্রায় ৬৫ বছর। ছোটবেলা থেকেই জেনেছি, সেতুটিতে সারিবদ্ধভাবে ফকিররা বসার কারণে এই সেতুর নাম ফকিরাপুল পরিচিতি পেয়েছে।’

তবে এই নামের কারণে বিতর্ক যে হয়নি তা কিন্তু নয়। গতবছর সেতুটিতে ভিক্ষুকদের এক মাস চলার মতো নগদ টাকা ও চাল দিয়ে ‘থানা ব্রিজ’ নামকরণ করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা। তারপরও ভিক্ষুকরা আবার এসে সেতুটিতে বসা শুরু করে।

নাম পরিবর্তন করায় বিতর্কের ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। আপত্তি জানানো হয় বিভিন্ন সংগঠন থেকে। তাদের দাবি, ‘ঘোড়াপট্রি ব্রিজ’ নামের সেতুটি ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ। এরইমধ্যে কেউ কেউ আবার ‘ফকিরাপুল ব্রিজ’ নামটাই রাখার দাবি জানান। প্রতিবাদের মুখে ‘থানা ব্রিজ’ লেখা সাইনবোর্ডটি অপসারণ করে পৌরসভা।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নাগরিক ফোরামের সভাপতি সাংবাদিক পীযূষ কান্তি আচার্য বলেন, কোনো অবস্থাতেই একটি সেতুর নাম থানার নামে হতে পারে না। ‘ঘোড়াপট্রি ব্রিজ’ হিসেবেই পরিচিত হওয়া উচিত।

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -spot_img

সর্বাধিক পঠিত