ট্রাফিক পুলিশ না থাকার কারণে রাস্তাঘাটে বেড়েই চলছে যানজট

0
8

চট্টগ্রাম নগরীতে সত্যি কোনো ট্রাফিক ব্যবস্থা রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ডিজিটাল যুগে চট্টগ্রাম নগরীতে সিগন্যাল বাতিতে নয়, ট্রাফিকের হাতের ইশারায় চলে যানবাহন। নগরজুড়ে দিন দিন বাড়ছে যানজট, নাগরিক দুর্ভোগ। রাস্তা দখল করে বসে হকার। কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করে রাখছেন নিজের মনে করে। চালকরা মানছেন না কোনো আইন-কানুন, ট্রাফিক পুলিশের সামনে রাস্তার ওপর যত্রতত্র যানবাহন রেখে যাত্রী ওঠানামা করা হচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এমন বিশৃঙ্খলায় নগরবাসীর নাভিশ্বাস উঠছে। যার কারণে যানজট এখন নগরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী। প্রতিদিন হাতে সময় নিয়ে বের হওয়ার পরও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে নগরীর স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীসহ বেশির ভাগ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবকে দায়ী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এসব কিছু দেখে এমন প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক যে সত্যি কোনো ট্রাফিক ব্যবস্থা আছে চট্টগ্রাম নগরীতে?

অধিকাংশ ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না। নগরীতে সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, হকারদের দখলে থাকা রাস্তা উদ্ধার এবং গাড়িচালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করছেন বন্দরবাসী। এ ছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় গতি আনার জন্য ট্রাফিক পুলিশ, পরিবহন শ্রমিক, মালিকদের নিয়ে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। আশ্চর্যের বিষয় হলো- ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে চট্টগ্রাম নগরীতে সিগন্যাল বাতি ছাড়া পুরোপুরি হাতের ইশারায় চলছে চট্টগ্রামের ট্রাফিক ব্যবস্থা। স্বয়ংক্রিয় কোনো ব্যবস্থা নেই। মুখে বাঁশি, লাঠি কিংবা হাতের ইশারা, এটাই চট্টগ্রামের রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যালের পদ্ধতি। নগরীর বিভিন্ন রাস্তায় এভাবেই যান চলাচলে ট্রাফিক পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে যানজট নিরসনে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সিগন্যাল বাতি থাকলেও চসিক ও ট্রাফিক বিভাগের সমন্বয়হীনতার কারণে এ সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে সিগন্যাল বাতি ব্যবহার না করায় এবং মেরামতের অভাবে সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যানজট সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করলেও এসব সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি।

নগরীর বহদ্দারহাট থেকে নিউমার্কেট মোড় পর্যন্ত পথের দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। এই পথে বাস থামার নির্ধারিত স্থান রয়েছে ৬টি। বহদ্দারহাট থেকে রওনা হয়ে নিউমার্কেট মোড়ে পৌঁছতে প্রতিটি বাসের সময় লাগে এক ঘণ্টারও বেশি। চকবাজার রোডের চলাচলকারী ১নং বাসগুলো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওাানামা করায়। যার ফলে পেছনের গাড়িগুলো আটকে থাকে। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। যেন তাদের কোনো দায়ই নেই।

হাটহাজারী রোডে ইবিএল বিআরটিএ শাখার কর্মকর্তা চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মো. ফরহাদ বলেন, প্রতিদিন অফিসের উদ্দেশে সকাল সাড়ে

৭টায় বাসা থেকে বের হই। বহদ্দারহাট, মুরাদপুর ও অক্সিজেন মোড়ে প্রায় দেড় ঘণ্টার যানজটের কবলে পড়তে হয়। কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব নেতা এস এম নাজের হোসাইন ভোরের কাগজকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট মাঠ পর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশ কেউ ঠিক মতো কাজ করছেন না। তারা যথাযথভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন না করার খেসারত দিতে হচ্ছে নগরীবাসীকে। এ ছাড়া চসিক ও সিএমপির মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। পরিবহন সেবা ও ব্যবস্থাপনায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভোক্তা প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান ভোরের কাগজকে বলেন, নগরীতে এখন কোনো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আছে বলে মনে হয় না। ট্রাফিক বিভাগের দুর্বলতার কারণে রাস্তায় যানজটের ভোগান্তি হয় বেশি। নগরীর ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রয়োজনমতো নগরীর সড়কগুলোতে গাড়ি চলাচলে একমুখী করতে হবে। সিগন্যাল বাতিগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে। যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা না করে নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানামা করার ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশকে কঠোর হতে হবে। এ ছাড়া অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গণপরিবহনের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি রাস্তা ও ফুটপাতে হকারদের উচ্ছেদ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান ভোরের কাগজকে বলেন, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ট্রাফিক বিভাগ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নগরীর যানজট কমাতে। উন্নয়ন কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িসহ নানা কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিদিন গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে। তবে নগরীর রাস্তাগুলো আয়তনে ছোট হওয়ায় যানজটের প্রধান কারণ। যানজট নিরসনে চালকদের গণসচেতনতার বিকল্প নেই। এ জন্য চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা জরুরি। ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান বলেন, নগরীর কয়েকটি জায়গায় পরীক্ষামূলক সিগন্যাল বাতি লাগানো হয়েছিল। তবে এগুলোর কার্যকারিতা নেই। ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি পুরো শহরজুড়ে লাগিয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণে দিলে ট্রাফিক সিস্টেমের একটা বড় পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি যানজট নিরসনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।