ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের দেখভাল করছে শিশুরাই, অসহায় বাবা-মা

0
6

আল-আমিন হাসান আদিব |

# মা মাদরাসা শিক্ষক, ভাইকে নিয়ে হাসপাতালে রিক্তা
# ছোট বোনের কান্না থামাতে খেলা করছে কেফায়া
# বাবা-ভাই অসুস্থ, তাসনুভাকে দেখে রাখে শারমিন
# রোগীর সঙ্গে শিশু ‘অকল্পনীয়’ বলছেন চিকিৎসকরা

ডেঙ্গু আক্রান্ত সাত বছরের আব্দুল্লাহ। গত মঙ্গলবার (৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। এরপর এক সপ্তাহ হাসপাতালের অষ্টমতলায় শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। আব্দুল্লাহর মা মান্ডা এলাকার আল-সাদিক ন্যাশনাল গাইডেন মাদরাসার শিক্ষক। দিনের বেলা ক্লাস নিতে যেতে হয় তাকে। শিশুটির বাবাও চাকরিজীবী। তিনি অফিসে। দিনের পুরোটা সময় আব্দুল্লাহকে দেখভাল করতে হয় ১৩ বছরের নূরনাহার রিক্তাকে।

রোববার দুপুরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অষ্টমতলার ডানপাশে কোণার দিক থেকে দ্বিতীয় বেডে আব্দুল্লাহকে শুয়ে কাঁদতে দেখা যায়। পাশে বসে ভাইয়ের মাথা নেড়ে দিচ্ছে বোন রিক্তা। আব্দুল্লাহ বোনের কাছে বারবার আকুতি করছে, ‘আপু চলো বাসায় চলে যাই। আম্মুকে বলো আর আসতে হবে না।’

রিক্তা ছোট ভাইকে বোঝাচ্ছে পুরোপুরি সুস্থ না হলে তোমার বাসায় যাওয়া যাবে না। হঠাৎ পায়ের যন্ত্রণায় কাতরে ওঠে আব্দুল্লাহ, তখন একহাতে পা এবং আরেক হাতে মাথা টিপে দিতে দেখা যায় রিক্তাকে।

রিক্তা জানায়, মান্ডার হায়দার আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বয়স ১৩ বছর। মাসখানেক আগে সেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল। এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সেরে ওঠে। এরপর তার ভাইয়ের জ্বর আসে। পরীক্ষা করে জানা যায় ডেঙ্গু।

সে বলে, ‘মাকে মাদরাসায় যেতে হয়। সকালে এসে খাবার দিয়ে আবার চলে যান। সন্ধ্যার আগে আবার আসেন। মাদরাসায় না গেলে চাকরি থাকবে না তো। আব্বুরও অফিস।’

রিক্তার সঙ্গে কথা বলার সময় ওই বেডের নিচে এবং পেছনের অংশে মশা ওড়াওড়ি করতে দেখা যায়। মশা কামড়ায় কি না, জানতে চাইলে রিক্তা বলে, ‘এহানে তো বহু মশা। পরিষ্কার না তো। আমার তো ডেঙ্গু হইয়া গেছে। আর হইবো না। টেনশন নেই।’ ডেঙ্গু একাধিকবার হতে পারে এমন তথ্য জানালে তা বিশ্বাস করতে নারাজ রিক্তা।

ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা। আক্রান্তও বেশি, মৃত্যুর হারও আশঙ্কাজনক। গত ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে ১১৯ জনই শিশু-কিশোর। হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গুরোগীর মধ্যেও বেশি শিশুরাই। বেঁচে ফিরলেও অনেকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভুগছে। ফলে চিকিৎসক-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুরক্ষা নিশ্চিতে সবার আগে শিশুদের মশার কামড় থেকে বাঁচাতে হবে।

অথচ হাসপাতালগুলো ঘুরলে চোখে পড়ছে এমন ভিন্ন চিত্র। ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের বেডে দেখা যায় রিক্তার মতো আরেক শিশুকে। কোনো বেডেই মশারি নেই। বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে শিশুরাই শিশুদের সেবা-শুশ্রূষা দিচ্ছে, এমন অসংখ্য দৃশ্য চোখে পড়ছে হাসপাতালগুলোতে। রোব ও সোমবার (১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে এমন অনেক দৃশ্য চোখে পড়ে।

ডেঙ্গু ওয়ার্ডে সুরক্ষাবিহীন এসব শিশুর বিচরণকে ভয়াবহ বলছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে শিশুদের হাসপাতালে প্রবেশ করতে দেওয়াই উচিত নয়। ইনফেকটেড একটি মশা আরেকজনকে কামড়ালেই সেও আক্রান্ত হবে। এমন ভাইরাসজনিত আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে শিশুদের থাকতে দেওয়া ‘অকল্পনীয়’।

কান্না করো না বুবু, এসো খেলি
ডেমরার সফিকুন্নবীর মেয়ে জান্নাতুল। বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। ডেঙ্গুর সঙ্গে ধরা পড়েছে টাইফয়েড। খেতে পারছে না কিছুই। শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে প্লাটিলেটও। শরীরে অস্বাভাবিক যন্ত্রণায় কাতর জান্নাতুল। তার সঙ্গে থাকা মা সুমিতা খাতুনও জ্বরে ভুগছে। মেয়ের বেডে গভীর ঘুমে তিনি।

যন্ত্রণায় বারবার কেঁদে উঠছে জান্নাতুল। তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে সাত বছরের কেফায়া। কেফায়া জান্নাতুলেরই বোন। বয়সে সে দেড় বছরের বড়। রোববার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এমন দৃশ্য দেখা যায় মুগদা মেডিকেলের শিশু ওয়ার্ডের ডানপাশের মেঝেতে। বেড না পাওয়ায় সেখানেই চিকিৎসা নিচ্ছে জান্নাতুল।

সেখানে গিয়ে দেখা যায়, জান্নাতুল ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে, তাকে সান্ত্বনা দিয়ে কেফায়া বলছে, ‘বুবু, কান্না করো না, এসো আমরা মেহেদী মেহেদী খেলি।’ বোনের সঙ্গে খেলায় মত্ত হয়ে যেন যন্ত্রণা ভুলে গেলো শিশুটি।

জান্নাতুলের মা কেফায়া বলেন, ‘আমার তিন মেয়ে। কেফায়া বড়, জান্নাতুল মেজো আর সবচেয়ে ছোট রুমানা। তিন মেয়েকে নিয়ে এসেছি। বাসায় কেউ নেই। ওদের বাবা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ব্যবসা করে। বাসায় থাকে না সারাদিন। মশায় কামড়ালেও কিছু করার নেই। ওদের কোথায় রেখে আসবো?

আব্বু-ভাইও অসুস্থ, মা আসে আবার বাসায় ছোটে

২২ মাস বয়সী তাসনুভাকে কোলের ওপর বালিশে শুইয়ে দোল দিচ্ছে বড় বোন শারমিন। দোল দেওয়া থামালেই কেঁদে উঠছে ছোট্ট শিশুটি। শিশু তাসনুভাকে দোল দিয়ে শান্ত রাখা বড় বোন শারমিন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। বয়স ১১ বছর। আব্দুল আজিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ে সে। সোমবার (১১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা শিশু হাসপাতালের মেঝেতে দেখা যায় এমন দৃশ্য।

শারমিন জানায়, তাদের বাসা মিরপুর ৬০ ফুট এলাকায়। এক সপ্তাহ ধরে তার বাবা শফিকুল ডেঙ্গু আক্রান্ত। তার বমির সঙ্গে রক্তও উঠেছে। তবুও বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। পাঁচদিন হলো তার বড় ভাই আসিফেরও জ্বর। তারও নাক দিয়ে রক্ত বের হয়েছে দু-তিনবার। এর মধ্যে শুক্রবার (৮ সেপ্টেম্বর) থেকে অসুস্থ তার ছোট বোন তাসনুভা। হাসপাতালে এনে শনিবার টেস্ট করানো হয়, তাতে ডেঙ্গু পজিটিভ আসে শিশুটির। ওর বয়স মাত্র ২২ মাস।

মা কোথায়— জানতে চাইলে সে বলে, ‘আব্বু-ভাই তো অসুস্থ, তাদের জন্য ভাত-তরকারি রান্না করা লাগে। তাদেরও খাওয়ানো লাগে। বাসায় তো আর কেউ নেই। মা একবার বাসায় যায়, আবার হাসপাতালে আসে। বোনটাকে (তাসনুভা) আমিই দেখে রাখছি।’

শুধু এ তিনটি ঘটনা নয়, মুগদা মেডিকেলের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে রয়েছে শিশু। অথচ একজনও মশারি ব্যবহার করছে না সেখানে। তবে শিশু হাসপাতালের চিত্র কিছুটা ভালো। সেখানে মশারি ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তবে রোগীর সঙ্গে আক্রান্ত না এমন শিশুও দেখা গেছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে থাকা শিশুরা সবাই প্রায় ভাই-বোন। এদের বাবা-মায়েরাও অনেকটা অসহায়। কেউ চাকরি বাঁচানো, কেউ বাসায় অন্য রোগীর সেবা, কেউ পেটের দায়ে সব সময় সন্তানের কাছে হাসপাতালে থাকতে পারেন না। নিরুপায় হয়ে আরেক সন্তানকে ঝুঁকি নিয়েই পাঠাতে হচ্ছে হাসপাতালে। আবার যাদের একাধিক সন্তান ছোট অথচ একজন আক্রান্ত তারাও বাধ্য হয়ে সুস্থজনকে সঙ্গে আনছেন। কারণ তাদের একা বাসায় রেখে আসার কোনো উপায় নেই।

যা বলছে মুগদা মেডিকেল কর্তৃপক্ষ

রোগী এলে তাদের দেখভাল ও পরিষ্কার-পরিছন্নতার প্রাথমিক কাজ করেন ওয়ার্ড বয়রা। তবে রোগীরা তাদের কথায় কান দেন না বলে জানান ওয়ার্ড বয় রাজু আহমেদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আর কতবার বলা যায় বলেন। আমরা বলি এভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত একটা বাচ্চার কাছে আরেকটা বাচ্চা রাখা উচিত নয়। কে শোনে আমাদের কথা। রোগীরা কানেই নেয় না।’

রোববার বিকেলে মুগদা মেডিকেল কলেজের শিশু ওয়ার্ডে দায়িত্বে ছিলেন সিনিয়র স্টাফ নার্স তনুশ্রী হালদার। ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে শিশুরা থাকছে এমন বিষয় দৃষ্টিগোচর করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো নিষেধ করি। রোগীরা সচেতন নয়। ডেঙ্গুরোগীর চাপ বেশি হওয়ায় শিশুদের নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করাও কষ্টসাধ্য হয়ে গেছে। কে, কখন কাকে নিয়ে ঢুকে পড়ছে, সেটা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

ডেঙ্গু ওয়ার্ডে কেউই মশারি টাঙাচ্ছে না- এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমি জানি না। পরিচালক স্যাররা বলতে পারবেন। নিয়ম তো আছে। কিন্তু কেউ তো মানে না। বেড ছাড়া মেঝেতে রোগীরা।’

জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক মো. নিয়াতুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মশারির রুলসটা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। রোগীর ব্যাপক চাপ। যে লোকবল তা দিয়ে সামলানোটাই কঠিন। শিশু রোগীর সঙ্গে অন্য শিশুর থাকার যে বিষয়টি বলছেন, সেটা হওয়ার কথা নয়। তারপরও আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো। এটা অ্যালাউ করা হবে না।’

ডেঙ্গুরোগীর সঙ্গে শিশুকে রাখা ‘অকল্পনীয়’
ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ড. রেজওয়ান হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গুরোগীকে ২৪ ঘণ্টা মশারিতে রাখতে হবে, এটা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। এটা শিশু হাসপাতালে আমরা করার চেষ্টা করছি। আর কোনো রোগীর সঙ্গে ১০-১২ বছরের শিশুকে যে কি না আক্রান্ত নয়, তাকে হাসপাতালে অ্যালাউ করি না আমরা। শিশুদের সেবার জন্য শিশুদের সঙ্গে রাখা হবে, এটা তো অলকল্পনীয়। এটা কোনো হাসপাতালে অ্যালাউ করা হয় বলেও আমি মনে করি না।’

এ শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এবার ডেঙ্গুর ভেরিয়েশনটা ভিন্ন। অনেক সময় বুঝে ওঠার আগেই বড়োসড়ো ড্যামেজ (ক্ষতি) হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর হারও বেশি। এমন পরিস্থিতি অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। আক্রান্তদের থেকে শিশুদের নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। বাসা যদি কাছাকাছি হয়ও তবুও সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে আদরের সন্তান।’