দীর্ঘ পথ জুড়ে ট্রাকের সারি! যেভাবে পশ্চিমা পণ্য রাশিয়ায় ঢুকছে

আন্তর্জাতিক স্বাধীন ডেস্ক

দিনের পর দিন মালামাল নিয়ে অপেক্ষা করে ট্রাকগুলো। গাড়ির যন্ত্রাংশ, শিল্পকারখানার জিনিসপত্র, রাসায়নিক পদার্থ, এমনকি টি-ব্যাগের কাগজ পর্যন্ত পরিবহন করে এ ট্রাকগুলো।

রাশিয়ার সীমান্তের কাছে জর্জিয়ার একটি পার্বত্য মহাসড়কে প্রতিদিন পণ্যবাহী ট্রাকের বিশাল লম্বা সারি দেখা যায়। প্রতিদিনই মনে হয়, কালকের সারির চেয়ে আজকেরটা বেশি লম্বা। এ ট্রাকগুলো রাশিয়ার জন্য পশ্চিমা পণ্য সরবরাহ করে। খবর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের।

দিনের পর দিন মালামাল নিয়ে অপেক্ষা করে ট্রাকগুলো। গাড়ির যন্ত্রাংশ, শিল্পকারখানার জিনিসপত্র, রাসায়নিক পদার্থ, এমনকি টি-ব্যাগের কাগজ পর্যন্ত পরিবহন করে এ ট্রাকগুলো।

ট্রাকের এ যাত্রা সাধারণত শুরু হয় তুরস্ক থেকে। আর শেষ হয় রাশিয়ার শহর ও নগরগুলোতে যেখানে পশ্চিমা পণ্যের তীব্র চাহিদা রয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্য অনেকাংশে থমকে যায়। কিন্তু আমদানির বিকল্প উপায় খুঁজে বের করে খুব দ্রুতই রাশিয়ার অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

গত ১০ মাস ধরে সাবেক সোভিয়েত রিপাবলিক দেশ জর্জিয়া রাশিয়া ও বহির্বিশ্বের মধ্যকার বাণিজ্যের সুবিধাজনক মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

আর এর ফলে লাভের মুখ দেখছেন ট্রাকচালকেরা। তুর্কি থেকে রাশিয়ায় মালামাল পরিবহনের একটি কোম্পানি আছে ৪৮ বছর বয়সী জর্জিয়ান মুরমান নাকাশিদজের। মস্কোর সঙ্গে ইউরোপীয় অনেক কোম্পানি বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করার পর তার ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে।

এখন তার ফোন সারাক্ষণ বাজতে থাকে, নিয়মিত পরিবহন অর্ডার পান তিনি। তার ফিও বাড়তে থাকে একইসঙ্গে। ‘অনেকের কাছে এটি একটি যুদ্ধ, কিন্তু অন্যরা এ থেকে লাভবান হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য ভালো, কিন্তু অন্যদের জন্য খারাপ।’

তুর্কি থেকে রাশিয়ায় স্থলপথে সবচেয়ে দ্রুত যাওয়া যায় জর্জিয়ার মধ্য দিয়ে। ২০২২ সালের প্রথম ছয় মাসে তুর্কি ও রাশিয়ার পণ্য পরিবহন তিনগুণ হয়েছে আর এর বেশিরভাগ গিয়েছে জর্জিয়া হয়ে। এসব তথ্য জানা গেছে জর্জিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ ব্যাংক টিবিসি ক্যাপিটাল-এর এক গবেষণা থেকে।

ডিসেম্বর মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জর্জিয়া-রুশ সীমান্তে ট্রাকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি ছিল বলে রাশিয়ান ফেডারেল কাস্টমস সার্ভিসের তথ্যে জানা গেছে। সীমান্ত চেকপয়েন্টের এত বেশি সংখ্যক পরিবহন সামলানোর ক্ষমতা নেই।

বেলারুশিয়ান, কাজাখ, উজবেক; সবাই এখন এখানে। এরা আগে ছিল না,’ দীর্ঘসারিতে অপেক্ষা করার সময় ট্রাক ঠিক করতে করতে বলেন ৬০ বছর বয়সী আলিক ওগানেসিয়ান। মাঝেমধ্যে এত দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে ট্রাকের অনেক মালামাল নষ্ট হয় যায় বলেও জানান তিনি।

রাশিয়ান সীমান্ত কর্তৃপক্ষ চেকপয়েন্টে লেনের সংখ্যা বাড়াতে কাজ করছে। অন্যদিকে মহাসড়কের যে স্থানটি প্রায় হিমবাহের কারণে বন্ধ হয়ে যায়, সেখানে ৫.৫ মাইল দীর্ঘ টানেল নির্মাণ করছে জর্জিয়া।

মাঝেমধ্যে ট্রাকের এ সারি সীমান্ত থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে জর্জিয়ার রাজধানী টিবিলিসি পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। চালকেরা মহাসড়কের বাইপাসে বিশেষ পার্কিং লটে ট্রাক দাঁড় করিয়ে ঘুমান ও বিশ্রাম করেন।

তবে এ সারি একেবারে একটানা নয়। কারণ পাহাড়ি পথের অনেক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চালকেরা যাত্রা শুরু করলে তাদেরকে পার্কিং করার জায়গার টিকিট দেওয়া হয়। আর জর্জিয়ার পুলিশ এ ট্রাকগুলোর চলাচল দেখাশোনা করেন।

দীর্ঘ অপেক্ষা করতে না চাইলে অনেক চালক প্রতিবেশী আজারবাইজান হয়ে ঘুরে রাশিয়া যান। এতে অবশ্য তাদের যাত্রায় কয়েক দিন বেশি যোগ হয়।
জর্জিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া এসব মালামালের কোনগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞায় রয়েছে, তা বলা অসম্ভব। তবে রাশিয়ার বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে উদ্ভূত হয়ে জর্জিয়া ইইউ’র নিষেধাজ্ঞা পলিসির একটি সম্ভাব্য ফাঁক সামনে এনে দিয়েছে।

জর্জিয়ার সরকার অবশ্য বারবার জানিয়েছে, তারা কড়াভাবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করছে এবং অনেক শিপমেন্ট রাশিয়ায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

তবে দেশটির বিরোধী দলগুলো বলছে, পণ্য ও অর্থ প্রবাহের এ প্রক্রিয়াটি বড় অংশে কোনোপ্রকার বাধা ছাড়াই সম্পন্ন হচ্ছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক মারিয়া শাগিনা বলেন, ‘জর্জিয়া এর আনুষ্ঠানিক পশ্চিমামুখীতা ও রাশিয়ার ওপর এর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা; এ দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে।’ তিনি আরও বলেন, বাণিজ্যের এ দ্রুত প্রবৃদ্ধির ফলে জর্জিয়ার পক্ষে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

রাশিয়া এর খাদ্যদ্রব্যের বেশিরভাগ দেশের অভ্যন্তরেই উৎপাদন করে, ভোগ্যপণ্য আসে এশিয়া থেকে। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট দেশটির কারখানাগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট মোকাবেলায় জর্জিয়ার বাণিজ্যপথটি ভ্লাদিমির পুতিনের দেশকে সাহায্য করছে বলে মন্তব্য করেন ইনফোলাইন নামক একটি রাশিয়ান বাজার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ইভান ফেদিয়াকভ।

সব মিলিয়ে ২০২২ সালের শেষ নাগাদ রাশিয়া আমদানির ক্ষেত্রে যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থানে ফিরে গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পাশাপাশি কাস্টম শুল্কের বরাতে বাড়তি একটি বৃহৎ আয়ের উৎসও পেয়েছে দেশটি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অব জর্জিয়া’র প্রধান আলেকসান্ডার দাভিতিদজে বলেন, তার সংগঠনের সদস্যরা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা কোনো রাশিয়ান পণ্য পরিবহন করেন না। কিন্তু ছোট ছোট কোম্পানিগুলো হয়তো সেটা করতে আগ্রহ দেখাবে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই বিভিন্ন রাশিয়ান কোম্পানি ও ব্যক্তি রাশিয়ায় পণ্য পরিবহনের জন্য তার কাছে অনুরোধ করতেন। কিন্তু এখন সেরকম কোনো অনুরোধ পান না বললেই চলে।

‘এর অর্থ হয় তারা মালামাল পরিবহনের জন্য অন্য কোম্পানি খুঁজে পেয়েছে, অথবা নিজেদের কোম্পানি গড়ে নিয়েছে,’ এক সাক্ষাৎকারে বলেন তিনি।

২০০৮ সালে রাশিয়া-জর্জিয়ার মধ্যে যুদ্ধ হয়। তখন জর্জিয়ার এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চলের দখল নিয়েছিল রাশিয়া। রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির এমন অর্থনৈতিক সহযোগিতায় অনেক জর্জিয়ান নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের টিবিলিস শাখার উপনির্বাহী সম্পাদক জিওর্জি অনিয়ানি বলেন, ‘আমাদের সরকার মাঝখানে থাকাটা বেছে নিয়েছে। কিন্তু অনেকে নিদেনপক্ষে ব্যক্তিগতভাবে রাশিয়া ও ক্রেমলিনের সঙ্গে নৈকট্য বোধ করে।’

‘যখন কোনো শক্ত রাজনৈতিক অবস্থান থাকে না, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো লাভের চিন্তা করে,’ বলেন টিবিসি ক্যাপিটালের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট জিওর্জি ঝাভানাদজে। তুরস্ক ও রাশিয়ান ব্যাংকগুলো ‘জর্জিয়াকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে আর সেজন্য আমরা সেগুলোকে শাস্তি দিই না।’

জর্জিয়ার সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর পোটি। কৃষ্ণ সাগরের এ বন্দরের সক্ষমতা দ্বিগুণ বাড়াতে ও বড় জাহাজ ভেড়াতে যুদ্ধের আগে থেকেই কাজ শুরু করেছে জর্জিয়া। যুদ্ধের পর এ বন্দর রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু এ বন্দর থেকে কোনো পণ্য খালাস করার পর তা কোথায় যায়, তা বন্দরটির পরিচালনা কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারের বাইরে।

তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্দরটির বেশিরভাগ পণ্যের গন্তব্য রাশিয়া নয়, বরং মধ্য এশিয়া।

এই ওয়েবসাইটের সকল লেখার দায়ভার লেখকের নিজের, স্বাধীন নিউজ কতৃপক্ষ প্রকাশিত লেখার দায়ভার বহন করে না।
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -