দেশীয় পণ্যের ম্যাজিক ঈদ-রমজান-পহেলা বৈশাখে

0
96

‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ফের বেড়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও সারতে হবে। আবার মধ্যবিত্তের চাওয়া প্রতিযোগিতামূলক কম দামে ক্রয়-বিক্রয়ের বন্দোবস্ত। এ অবস্থায় মার্কেট-শপিংমলে ঘোরাঘুরি ও ভিড় এড়িয়ে স্বাস্থ্যগত নিরাপদ উপায় খুঁজছেন ক্রেতারা ই-কমার্স, অনলাইন, ফেসবুক তথা ডিজিটাল সিস্টেমে কেনাকাটায়। ব্যাপকহারে ঝুঁকছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। এক্ষেত্রে বিদেশি বিশেষ করে ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর প্রতি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির ক্রেতা-বিক্রেতার অনীহা ফুটে উঠছে। ই-কমার্স ভিত্তিক ক্রয়-বিক্রয়ে দেশীয় পণ্যের ম্যাজিকে বাড়ছে চাহিদা। ঘটছে নীরব বিপ্লব।

এক. চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশের বাসিন্দা ব্যাংকার মোরশেদ মাহমুদ পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে খেজুর, ঘি, ঘানিভাঙা খাঁটি সরিষার তেল ও খেজুরের গুঁড় কিনেছেন রাজধানী ঢাকার একটি ই-কমার্স শপ থেকে। ভালো মানের পণ্য ও যৌক্তিক মূল্যে সন্তুষ্ট বলে জানান তিনি। ক্যাশ অন ডেলিভারি দেয়ার ক’দিন পর এসব পণ্য গুণগত মানে কেমন ছিল, ক্রেতা সন্তুষ্ট কিনা ফোন করে ফিডব্যাক জেনেছেন সংশ্লিষ্ট ই-শপ কর্মকর্তা।
দুই. চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার গৃহিনী সুলতানা রাজিয়া জানালেন, আসছে পহেলা বৈশাখে তিনি নিজের এবং স্বামী-সন্তানের জন্য দেশীয় একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে শখের পোশাক-বস্ত্রাদি পছন্দ করেই রেখেছেন। দুয়েকদিনের মধ্যে অনলাইনে অর্ডার প্লেস করবেন। অথচ ইতিপূর্বে কয়েক বছর তিনি কোলকাতায় গিয়ে পহেলা বৈশাখের কেনাকাটা সারেন। বললেন, যাচাই করে দেখেছি আমার দেশের শাড়ী, তৈরিপোশাক, বস্ত্রসামগ্রী ভারত কিংবা অন্যকোনো দেশের তুলনায় গুণেমানে কম কিসে?
শুধ্ইু মোরশেদ, সুলতানা নন। ই-কমার্স কেনাকাটায় জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে বিশেষত করোনাকালে। নিত্য ও ভোগ্যপণ্য, সামুদ্রিক মাছ-শুঁটকি, দুধ-দই, মিষ্টি, বেকারির খাদ্যপণ্য এমনকি দেশীয় ঢাউস গরু থেকে শুরু করে ওষুধ-পথ্য, সেবাপণ্য, আসবাবপত্রসহ গৃহস্থালী ও সৌখিন পণ্য, বইপত্র, কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ আইটি গেজেট ইত্যাদি এখন ই-কমার্স, অনলাইন, ফেসবুকসহ ডিজিটালি বিকিকিনি হচ্ছে। ঠকানোর কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটছে। সার্বিকভাবে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষের নজর কাড়ছে ই-কমার্স শপিং। যদিও ই-কমার্স এখনো পুরোদমে সিস্টেমে আসেনি।
একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ই-কমার্সের প্রসার তো হবেই। করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে গত এক বছরে ই-কমার্স কেনাকাটা প্রবলভাবে বেড়ে গেছে। যা খুবই স্বাভাবিক। ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকায় ভারতে যাওয়া কমেছে। এরআগে বড়লোকেরা ইন্ডিয়া থেকে শপিং করতেন। যা আমাদের অর্থনীতিতে সহায়ক নয়।
দেশে শপিং করলে বিয়েশাদির জৌলুশ কম হবে- এমন অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, করোনায় ই-কমার্স কেনাকাটা লেনদেন বেড়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থান হচ্ছে। অন্যদিকে মার্কেট-শপিংমলে বেচাকেনা কমে গেছে। গতবছর ঈদ-রমজানের মতো অতটা না হলেও এবারো কেনাকাটা কম হবে। মার্কেটগুলো জমবে না। দেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
মার্কেটসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে অনুসন্ধানে জানা যায়, মাহে রমজান, পবিত্র ঈদুল ফিতর এবং পহেলা বৈশাখ- সামনে এই তিন উৎসবকে ঘিরে ভারতীয় খাদ্যপণ্য, শাড়ী-চুড়ি, বস্ত্রসহ নিম্নমানের মালামালের দিকে আগ্রহ তেমন নেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের। রেয়াজুদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, নিউমার্কেট, সানমার, মিমিসুপার মার্কেটসহ বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিপণিকেন্দ্রে এবার আগেভাগে ভারতীয় শাড়ি, বস্ত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রীর ডাম্পিংয়ের সুযোগ তেমন ঘটেনি। দেশীয় পণ্যের কদর বৃদ্ধির ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কমে আসছে পণ্য চোরাচালান। কোলকাতা-দিল্লি-ব্যাংকক শপিং ট্যুর বন্ধ।
আর খুলে গেছে ই-কমার্সে দেশীয় হরেক পণ্যসামগ্রী বাজারজাতের সম্ভাবনাময় দুয়ার। শহর-নগর ছাড়িয়ে অনেক জেলা-উপজেলা সদরেও পৌঁছে গেছে ই-কমার্স নেটওয়ার্ক। এতে মানসম্পন্ন দেশীয় পণ্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। করোনায় অনলাইন কেনাকাটায় ই-পেমেন্ট ছাড়াও ক্যাশ অন ডেলিভারিতে স্বল্পতম সময়েই হচ্ছে কেনাকাটা। পরখ করে যদি পণ্যটি নিম্নমানের ও ক্রেতার অপছন্দ হয় তাহলে ডেলিভারি গ্রহণ না করারও সুযোগ রাখা হচ্ছে।
ই-কমার্স মধ্যস্বত্বভোগীর দাপটমুক্ত। উদীয়মান এ খাতে লাখো উদ্যমী তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ক্রেতারা তৃপ্ত। যেহেতু অর্ডার প্লেস করলেই অগ্রিম পেমেন্ট ছাড়াই দোরগোড়ায় সহজে মিলছে দেশীয় শিল্প-কারখানা, বুটিক-বাটিক, চারু-কারু, নিপুণ হাতে ঘরে তৈরি হরেক উন্নতমানের পণ্যসামগ্রী। ই-কমার্স খাতে ইতোমধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার বাজার সাইজ দাঁড়িয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রির ইন্টারনাল কমিটির আহ্বায়ক ও সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ ইনকিলাবকে বলেন, করোনায় মার্কেট-বিপণিকেন্দ্রে কেনাকাটার ভিড়ে ও মানুষের সংস্পর্শে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। অনেকে বাধ্য হয়েই নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ই-কমার্স নির্ভর হচ্ছেন। ডোর টু ডোর দেশীয় ভালোমানের পণ্যসামগ্রীর কেনাকাটা লেনদেন জনপ্রিয় হচ্ছে। এর আরো প্রসার প্রয়োজন। তবে কিছু অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কারণে ক্রেতারা প্রতারিতও হচ্ছেন। সমস্যাগুলো চিহ্নিত, সংশোধন ও নিরসন করলেই ই-কমার্স আরও সুফল দেবে। এ খাতে নতুন প্রজন্মের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।
একটি ই-কমার্স শপের নির্বাহী জাহিদুল হক জানান, গুণগত মানসম্পন্ন পণ্যসামগ্রীর গ্যারান্টি দিচ্ছি। অগ্রিম মূল্যও নিচ্ছি না। নিম্নমানের পণ্য বিবেচিত হলে ক্রেতা ক্যাশ অন ডেলিভারি নেবেন না। ফেরত আসবে। দেশীয় ভালোমানের পণ্যচাহিদা দিন দিন বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ক্যুরিয়ার পার্সেল সার্ভিসগুলো ছাড়াও নিজস্ব বাহক ও মার্কেটিং প্রতিনিধির মাধ্যমে ডেলিভারি দিতে গিয়েও হিমশিম অবস্থা। ক্রেতার রুচির ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। ই-কমার্স প্রসারে এটি শুভ দিক।
ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক, মূলত ইন্টারেনট ব্যবহার করে পণ্যসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়, অর্থ লেনদেন ও ডাটা আদান-প্রদানই হচ্ছে ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্য। ই-মেইল, ফ্যাক্স, অনলাইন ক্যাটালগ, ইলেকট্রনিক ডাটা ইন্টারচেঞ্জ (ইডিআই), ওয়েব বা অনলাইন সার্ভিসেস ইত্যাদি উপায়ে ই-কমার্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ই-কমার্স পরিচালনা করা হয় এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আরেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে (বি টু বি), ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তার (বি টু সি), ভোক্তা ও ভোক্তার (সি টু সি) মধ্যে। অনেকটা স্বয়ংক্রিয় আদান-প্রদানে বিপণন প্রক্রিয়াই ই-কমার্স।
বাংলাদেশে বেশিরভাগই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বা ই-শপ সত্যিকার অর্থে তথ্য-প্রযুক্তির বিবেচনায় পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়ায়নি এখনও। অনেক ই-শপ নিছক ফেসবুক নির্ভর। তা সত্তে¡ও তারা ভিনদেশি আলীবাবা, অ্যামাজন এবং বাংলাদেশের দারাজ, চালডাল, পাঠাও, সহজ, সিন্দাবাদ, ফুডপান্ডার মতো বড়সড় প্রতিষ্ঠানের সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অবস্থান থেকে জোরকদমে এগুচ্ছে। সুপার চেইন শপগুলোতে অনলাইনেও কেনাকাটা বাড়ছে। তৃণমূল পর্যায়ের ক্রেতা-বিক্রেতারা ক্রমেই সম্পৃক্ত হচ্ছেন। ই-কমার্সের উত্থানের ধারা বজায় থাকলে ২০২৫ সালে এর মার্কেট সাইজ হবে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কাজের সুযোগ পাবেন কয়েক লাখ তরুণ-যুবক ও যুব-মহিলা। ই-কমার্স বদলে দেবে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পুরনো গৎবাঁধা চালচিত্র।