ধানের ভালো ফলনেও কমবে না চালের দাম

আলামিন হোসেন শাকির
স্টাফ রিপোর্টারঃ

দেশে এখন আমনের ভরা মৌসুম। এ সময় সাধারণত চালের দাম কম থাকে। কিন্তু এ বছর দাম না কমে উল্টো কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আমনের ভালো ফলন হলেও চালের দাম কমার সম্ভাবনা নেই। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সার্বিকভাবে এ বছর ধানের উৎপাদন কম হবে। আবার চালের আমদানিও কমেছে। ডলারের উচ্চমূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাবও চালের বাজারে পড়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও সারের দাম বেড়ে যাওয়া উৎপাদন খরচ বেড়েছে কৃষকের।

সমবার (২১ নভেম্বর) রাজধানীর খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়। নাজিরশাইল চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা এবং মাঝারি মানের বিআর আটাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। মোটা ‘স্বর্ণা’ বিক্রি হচ্ছে ৫৬ টাকায় ও হাইব্রিড মোটা চালের কেজি ৫০ টাকা।

এক সপ্তাহ আগেও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ছিল ৬৫ থেকে ৭২ টাকা, নাজিরশাইল ৬৫ থেকে ৭৮ টাকা, মাঝারি মানের বিআর আটাশ চাল ৫২ থেকে ৫৬ টাকা, ‘স্বর্ণা’ ৪৬ টাকা এবং হাইব্রিড মোটা ৪৬ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও ধান-চালের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও সারের দাম বেশি থাকায় ধানের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে ধানের দামও গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি মণে প্রায় ২০০ টাকা বেশি। যে কারণে আমন ধান ওঠার মৌসুমেও চালের দাম না কমেছে না।

সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মণ্ডল স্বাধীন নিউজকে বলেন, ‘এখন আমি চালের দাম কমার সম্ভাবনা দেখছি না। এর একাধিক কারণ আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনিস্টিটিউট (ব্রি) একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবছর সার্বিকভাবে ধানের উৎপাদন কম হবে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারিভাবে ১৯ লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র তিন থেকে চার লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে।’

আমদানি কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে সাবেক এই খাদ্য সচিব বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন কারণে চাল আমদানি করতে পারছি না। এর মধ্যে ডলারের ‍উচ্চমূল্য, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়া কিংবা পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মতো অনেক বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া অনেক দেশ খাদ্যশস্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এসব কারণ সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি কমে গেছে।’

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২১ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারি গুদামে চাল মজুত রয়েছে ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬২ টন এবং ধান মজুত রয়েছে ৬ হাজার ২৮৯ টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের আমন মৌসুমে ৫৬ লাখ ২০ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে মোট এক কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার আট টন চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে খরা ও পরবর্তী সময়ে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে আমনের আবাদ কম হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে সেই আশঙ্কা কাটিয়ে এখানো পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আবাদ বেশি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) ফিল্ড সার্ভিস উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আবদুহু বলেন, ‘আমনের ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৫৯ লাখ টন। এর বিপরীতে ফলন ১ কোটি ৭০ লাখ টনের বেশি হতে পারে।’

বাংলাদেশ মূলত ভারত, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে চাল আমদানি করে। এসব দেশেও চালের দাম বাড়তি। আবদুল লতিফ মণ্ডল বলেন, ‘ভারত চালের রপ্তানির উপর ২০ শতাংশ কর আরোপ করছে। ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডে চালের দাম বেড়েছে। কাজেই এসব দেশ থেকে চাল উচ্চমূল্যে আমদানি করতে হবে। এ কারণে দেশে চালের দাম কমবে বলে মনে হয় না।’

দেশে চালের দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে আবদুল লতিফ মণ্ডল বলেন, ‘প্রতিবছর দেশে ২০ লাখ মানুষ বাড়ে। এ কথা কৃষিমন্ত্রী নিজেই বলেছেন। এখন এক দিকে যদি ২০ লাখ নতুন মুখ আসে, আর অন্যদিকে যদি উৎপাদন কমে যায়, তাহলে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -