নাম শুনেই হয়তো ভাবছেন পাখির নাম আবার চুল্লি হয় নাকি?

শেখ আনোয়ার

নাম শুনেই হয়তো ভাবছেন পাখির নাম আবার চুল্লি হয় নাকি? আসলে এ পাখিটির নাম ইংরেজীতে ওভেন বার্ড। চুল্লি বা চুলা হলো, আগুন প্রতিরোধী উপাদান দিয়ে ঘিরে তৈরি করা জিনিস। যা দিয়ে রান্না করা বা কোনো কিছু পোড়ানো হয়। চুল্লি পাখি কাঁদামাটি, গাছপালার আঁশ আর ঘাস দিয়ে চুল্লি বা পাউরুটি বানানোর ওভেনের মতো আকৃতির বাসা বানায় বলেই ওদের এমন নাম। ব্রাজিল, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার উন্মুক্ত সমভ‚মিতে লোকালয়ের কাছেই এদের আবাস-নিবাস। ছোট আকারের এ পাখিটির দৈর্ঘ্য মাত্র সাত-আট ইঞ্চি আর ওজন মাত্র দু’ আউন্স। এদের মাথা, ডানা ও পিঠ লালচে বাদামি কিন্তু বুক ফ্যাকাশে ক্রিম রঙের। দক্ষিণ আমেরিকায় ওরা পরিচিত বাসা বানানোর রাজমিস্ত্রী নামে। এদের ডাক বেশ সুরেলা ও মিষ্টি মধুর।

চুল্লি পাখিরা সারা বছর জোড়া বেঁধে থাকে। সাধারণত লোকালয়ের কাছেই ওদের দেখা মেলে। বাসা বানানোর মতো যুতসই কোন গাছ না পেলে ওরা বাড়িঘরের বেড়ার খুঁটির ওপরে কিংবা বাড়ির ছাদের ওপরেই বাসা বানায়। দিনের বেলায় ওরা খাবারের খোঁজে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু রাতে চুল্লি বাসায় আরাম করে বিশ্রাম নেয়। গবেষকরা বলেন, বাসা বানানোর ছোট ছোট খড়কুটো ধরার জন্য চুল্লি পাখির পা চমৎকারভাবে অভিযোজিত। এদের প্রত্যেকটি পায়ে পাঁচটি করে আঙ্গুল রয়েছে। চারটি সামনের দিকে আর অবশিষ্টটি পেছনের দিকে থাকে। এরা বেশ আস্তে আস্তে হাঁটে। হাঁটার সময় প্রায়ই এরা এক পা ভাঁজ করে রাখে। অন্যান্য প্রজাতির পাখিদের মতো ওভেন বার্ড বা চুল্লি পাখিও মাটিতে ঠুকরে ঠুকরে খাবার খোঁজে। প্রত্যেকটি চুল্লি পাখি একটি নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে খাবার খোঁজে। এদের খাবারের তালিকায় রয়েছে মাটির গর্তে থাকা পোকা-মাকড়, বিভিন্ন অমেরুদন্ডী প্রাণী, পোকামাকড়ের লার্ভা, মাকড়শা ইত্যাদি। সাধারনত: ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থেকে ওরা খাবার খোঁজে।

নরম ভেজা কাঁদামাটি দিয়ে এই ওভেন বার্ড বা চুল্লি পাখি বাসা বানায়। বাসাটিকে মজবুত করতে ওরা কাঁদামাটির সঙ্গে মেশায় ঘাস আর গাছপালার নরম আঁশ। কোন গাছের ওপরে, বড় কোন খুঁটির ওপরে এমনকি ছাদের ওপরেও ওরা বাসা বানায়। রোদের তাপে শুকিয়ে বাসা বেশ শক্ত পোক্ত হয়ে ওঠে। একটি বাসাতে একজোড়া চুল্লি পাখি দু’তিন বছর পর্যন্ত থাকতে পারে। এরপর হয়তো বৃষ্টির পানিতে বাসাটি নষ্ট পরিত্যাক্ত হয়ে যায়। প্রতিবছর ওরা পুরনো বাসাটির ওপরেই আরেকটি নতুন বাসা বানায়। পুরনো বাসাটিতে তখন পোকা মাকড় কিংবা অন্য কোন পাখি থাকে।

গবেষকরা খেয়াল করে দেখেছেন, চুল্লি পাখির একটি বাসা তৈরিতে দেড় হাজার থেকে দু’হাজারটি আলাদা আলাদা ছোট ছোট কাঁদামাটির স্তুপ লাগে। একেকটি বাসার ওজন প্রায় সাত থেকে বারো পাউন্ড হয়ে থাকে। এই পাখির অন্যান্য কয়েকটি গোত্রের নাম প্লেইন্সরানার (সমতলে দৌঁড়ায় যারা), ক্যাসেল বিল্ডার (দুর্গ নির্মাতা), লিফগিøনার (পাতাকুড়ানি) এবং থিসলটেইল (সুইলেজা)। এদের বাসার উষ্ণ অবস্থার কারণে এতে প্রচুর পোকামাকড় বাসা বাঁধে। বাসা না ভেঙ্গে এর ভেতরের অবস্থাটা পর্যবেক্ষণ করা বেশ কঠিন বলে চুল্লি পাখিদের বংশবৃদ্ধি ও বাসা বানানোর অভ্যাস সম্পর্কে গবেষকদের খুব বেশি কিছু জানা এখনো সম্ভব হয়নি। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, শীতকালে পুরুষ ও স্ত্রী পাখি উভয়ে মিলেই বাসা বানায়। কোন গাছে কিংবা বেড়ার ওপরের কোন খুঁটিতে বাসা বানানোর জায়গা পছন্দ করার পরই ওরা গর্তের

মতো আকারের বাসা বানাতে শুরু করে। বাসা রোদে শুকিয়ে কিছুটা শক্ত-পোক্ত হবার পর ওরা এর কিনারার দিকে আরো কিছু কাঁদামাটি আর গাছপালার আঁশ যোগ করে। বলের মতো গোলাকার না হওয়া পর্যন্ত ওরা বাসা বানাতেই থাকে। বাঁকানো সরু প্রবেশ পথটি তৈরি হবার পর ওরা বাসা বানানোর কাজ শেষ করে।

স্ত্রী চুল্লি পাখিটি বাসার ভেতরের ডিম পাড়ার গর্ততে ঘাস আর পালকের নরম আস্তর দিয়ে ঢেকে বিছানা বানায়। কয়েকদিন পর স্ত্রী পাখিটি বাসায় তিন থেকে পাঁচটি দুধের মতো সাদা ডিম পাড়ে। বাসার ভেতরের ওমে কুড়ি দিনের মধ্যেই ডিমগুলো ফুঁটে বাচ্চা বের হয়। এর আঠেরো দিন পর বাচ্চাদের দেহে নতুন পালক গজায়। বাচ্চারা তিন মাস পর্যন্ত মা-বাবার সঙ্গেই থাকে।

বিশাল পৃথিবীর অজানা প্রাণীজগতে চুল্লি পাখি বা ওভেন বার্ডের নির্মাণ শৈলী মানুষকে অবাক ও বিস্মিত করে।

শেখ আনোয়ার: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক। এম.ফিল স্কলার, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এই ওয়েবসাইটের সকল লেখার দায়ভার লেখকের নিজের, স্বাধীন নিউজ কতৃপক্ষ প্রকাশিত লেখার দায়ভার বহন করে না।
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -