পদ্মা সেতুতে যখন থেকে ট্রেন চলবে

0
186

বিশেষ রিপোর্ট ডেস্ক : ঢাকা-মাওয়া অংশের কাজের অগ্রগতি ৫১ শতাংশ। এ অংশের বাকি কাজ শেষ করতে এক বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে ভাঙ্গা থেকে যশোর অংশের কাজের অগ্রগতি ৪৬ শতাংশ। আগামী জুনে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেও পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলু করতে এক বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন।

তিনি বলেন, “আপাতত লক্ষ্য আগামী বছ‌রের ২৬ মার্চ ঢাকা থে‌কে মাওয়া পদ্মা সেতু হ‌য়ে ফ‌রিদপু‌রের ভাঙ্গা জংশন পর্যন্ত ট্রেন চালা‌নো। তা সম্ভব না হ‌লে আগামী বছ‌রের জু‌নে ঢাকা থে‌কে পদ্মা সেতু হ‌য়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চল‌বে। ২০২৪ সা‌লের জু‌নে ঢাকা থে‌কে য‌শোর পর্যন্ত ট্রেন চল‌বে।

রোববার নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু রেল সং‌যোগ প্রকল্প প‌রিদর্শনে গিয়ে সাংবা‌দিক‌দের এ তথ্য জা‌নান রেলমন্ত্রী।

রেলমন্ত্রী জানান, পদ্মা সেতুর চালুর প্রথম দিন থেকে এর ওপর দিয়ে ট্রেন চালুর ঘোষণা থাকলেও তা হচ্ছে না।

এদিকে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক মোঃ আফজাল হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “আগামী ডিসম্বেরের মধ্যে ভাঙ্গা থেকে মাওয়া পর্যন্ত রেল চালুর লক্ষ্যে রয়েছে। আর ঢাকা-থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হবে আগামী বছরের জুনে।”

তিনি আরো বলেন, আগামী জুনে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে ছয় মাসের মধ্যে অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ভাঙ্গা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৪০ কিলেমিটার রুটে রেল চালু করা সম্ভব হবে এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে রেলওয়ে।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, ভাঙ্গা – মাওয়া রুটে রেল পথ নির্মাণের কাজের এপ্রিল পর্যন্ত ৭৮ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এ অংশের বাকি কাজ আগামী ডিসেম্বর শেষ করা সম্ভব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুতে রেল লাইন স্থাপনের স্বার্থে সেতু বিভাগকে সাইট হ্যান্ডওভার জুলাই মাসের আগে শেষ করতে হবে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও গত বুধবার জানান, জুনে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে। ফলে পদ্মা সেতুতে রেল লাইন স্থাপনের কাজ জুলাই মাস থেকে শুরু করা যাবে বলে আশা করছে রেলওয়ে।

প্রকল্প পরিচালক জানান, তিনটি অংশে ভাগ করে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ চলছে। এরমধ্যে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা অংশের বাস্তবায়ন অগ্রগতি অন্য দুই অংশের চেয়ে ভালো।

ঢাকা-মাওয়া অংশের কাজের অগ্রগতি ৫১ শতাংশ। এ অংশের বাকি কাজ শেষ করতে এক বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে ভাঙ্গা থেকে যশোর অংশের কাজের অগ্রগতি ৪৬ শতাংশ।

পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেল সংযোগ চালু হলে ঢাকা সঙ্গে দেশের দক্ষিণ –পশ্চিম অঞ্চলের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে এবং নতুন করে মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারিপুর, নড়াইল জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে।

এর পাশাপাশি ঢাকা-যশোর-বেনাপোল – কলকাতা পর্যন্ত ট্রান্স এশিয়ান নেটওয়ার্কের আরেকটি উপ-রুট চালু করা যাবে। ফলে এ রুটে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্রেইট ও ব্রডগেজ কন্টেইনার ট্রেন চলাচল করতে পারবে।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, সেতু কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা। তবে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে যান চলাচল শুরু হলে ভাইব্রেশনের কারণে দ্বিতল সেতুর নিচে রেল লাইন স্থাপনে কাজ কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ভাইব্রেশনের পরিমাণ নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ বিষয়ে টেকনিক্যাল কমিটি ট্রাফিক এবং এর গতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভাইব্রেশন এফেক্ট ম্যানেজ করতে হবে। আর এতে সেতু রেল লাইন স্থাপনের কাজে শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে মাওয়া-ভাঙ্গা রুটে রেল পরিচালনা করা যাবে।

এদিকে গত মাসে প্রকাশিত বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে বলে হয়েছে, পদ্মা রেল সংযোগের প্রকল্পের ভাঙ্গা থেকে মাওয়া অংশে এমব্যাংকমেন্ট, ব্রিজ-কালভার্ট, আন্ডারপাস ভায়াডাক্ট নির্মাণের কাজের অগ্রগতি প্রায় শতভাগ। এ অংশের ৫টি স্টেশন ভবনের মধ্যে ২ টির কাজ এখনও শুরু করা হয়নি। বাকি তিনটির নির্মাণ কাজ চলছে। তবে এর মঙ্গে ভাঙ্গা জংশন স্টেশনের কাজ মাত্র শুরু হয়েছে।

আইএমইডির কর্মকর্তারা জানান, পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকে এ সেতু দিয়ে রেল যোগাযোগ চালুর ঘোষণা ছিল সরকারের। কিন্তু পদ্মা সেতু এবং পদ্মা রেল সংযোগ দুটি প্রকল্পেরই কাজে ধীর গতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

সেতু বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালে শুরু হওয়া পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি শতকরা ৯৮ ভাগ, নদীশাসন কাজের বাস্তব অগ্রগতি শতকরা ৯২ ভাগ এবং মূল সেতুর কার্পেটিং কাজের অগ্রগতি শতকরা ৯১ ভাগ। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি শতকরা ৯৩ দশমিক ৫০ ভাগ।

অন্যদিকে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিল পর্যন্ত পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৫৬ শতাংশ।

পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬২ কিলোমিটার রেল লাইন নির্মাণ হবে। প্রকল্পটি অনুমোদন হয় ২০১৬ সালের মে মাসে। চীনের সঙ্গে ঋণ চুক্তি হতে দুই বছর সময় চলে যায়। ঋণ চুক্তির পর প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাই মাসে।

করোনাকালীন সময়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজের গতি আরো কমে যায়।

করোনাকালীন ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং বর্তমান সরকারের ডে-ওয়ান স্ট্রাটেজি প্রতিপ্রালন করে মাওয়া –ভাঙ্গা সেকশনে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের দিন থেকে ট্রেন চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রেলওয়েকে ২০২১ সালের অক্টোবরে চিঠি দেয় আইএমইডি।

চিঠিতে আইএমইডি ব্যাকআপ প্ল্যান হিসেবে রেল স্থাপনের কাজের গতি আরো বৃদ্ধির জন্য ঠিকাদারের জনবল ও নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত ইক্যুইপমেন্টস, মেশিনারি বৃদ্ধি করার পরামর্শ দেয়।

এ বিষয়ে চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডকে চিঠি দেওয়া হলে তারা অতিরিক্ত ২০ মিলিয়ন ডলার দাবি করে। অতিরিক্ত অর্থায়ন করা হলে জনবল, নির্মাণ সামগ্রী, মেশিনারি বৃদ্ধি করে ডে ওয়ান স্ট্রাটেজি পূরণ করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে শুধু মেইন লাইন নির্মাণ করা সম্ভব হবে। সিগন্যালিং সিস্টেম, পুল লাইন, ভাঙ্গা স্টেশন, শিবচর স্টেশন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা যাবে না বলে জানিয়েছিল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। চায়না ঠিকাদারের দাবি পূরণ না হওয়ায় প্রকল্পের কাজে গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। এ অবস্থায় সরকারের ডে-ওয়ান স্ট্যাটেজিও পূরণ হয়নি।