advertisement

পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণে শিল্প মালিকদের উৎসাহিত করবে

স্বাধীন নিউজ ডেস্ক

কারখানার কর্মপরিবেশ ভালো এবং পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রথমবারের মতো ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ চালু করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মুজিব বর্ষকে গৌরবোজ্জ্বল ও স্মরণীয় করে রাখতে এ পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতি বছর তৈরি পোশাক খাত, চা, প্লাস্টিক, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত—এ ছয় খাত থেকে ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দেয়া হয়েছে। প্রথমেই পুরস্কারপ্রাপ্ত কারখানাগুলোকে অভিনন্দন। নিঃসন্দেহে এ উদ্যোগ অন্যান্য কারখানাকেও সবুজ রূপান্তরে উদ্বুদ্ধ করবে। এক্ষেত্রে গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড পাওয়া কারখানাগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে বাড়তি সুবিধা দেয়া প্রয়োজন, যাতে অন্যরাও উৎসাহিত হয়। বাংলাদেশ এখন ১৫২টি সবুজ কারখানার আবাসস্থল। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন। সরকারের সহায়তা ও উৎসাহ এক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজন।

কলকারখানা স্থাপনে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ধারণাটি হচ্ছে ‘গ্রিন কারখানা’। পরিষ্কার বাংলায় এটাকে ‘পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা’ বলা যেতে পারে। ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) সবুজ কারখানার সনদ দেয়। ইউএসজিবিসি প্রদত্ত এ সনদের নাম লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডিজাইন (এলইইডি)। পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা ধারণাটিতে কারখানা স্থাপনে অনেক সময়োপযোগী ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, যে পরিমাণ জমির ওপর কারখানা স্থাপন করা হবে, তার অর্ধেকটাই ছেড়ে দিতে হয় সবুজায়নের জন্য। কারখানার চারপাশে খোলা জায়গাসহ সবুজ বাগান থাকতে হয়; কারখানার ভেতরেও থাকতে হয় খোলা জায়গা। শ্রমিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে এক শ্রমিক থেকে অন্য শ্রমিকের অবস্থানে যথেষ্ট পরিমাণ দূরত্বও থাকতে হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে কারখানার শ্রমিকদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখতে হয়। কারখানার ভেতরে রাখতে হয় আবাসন ব্যবস্থা। শ্রমিকদের যাতায়াতের জন্য থাকতে হয় বিশেষ সুবিধা; চিকিৎসা ভাতাসহ রেশনিংয়েরও ব্যবস্থা বলবৎ থাকতে হয়। উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবকিছুই অটোমেশনে হতে হয়। মেশিনারিজ হতে হয় অত্যাধুনিক। থাকতে হয় সোলার প্যানেল, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এলইডি লাইট। এছাড়া পানি রি-সাইক্লিংয়ের সুব্যবস্থাও থাকতে হয়। শুধু কর্মপরিবেশ নয়, সামগ্রিক পরিবেশ উন্নয়নে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আলোচ্য পুরস্কার দিয়েছে। কারখানা নির্মাণে কী ধরনের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, কারখানায় সূর্যের আলো কী পরিমাণ ব্যবহার হয়, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার করা হয় কিনা, এসব বিষয় দেখা হয়েছে। একটি কারখানায় জীবন ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কতটা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কক্ষে আলোর ব্যবস্থা, সহনীয় শব্দমাত্রা ও আরামদায়ক উষ্ণতাও দেখা হয়েছে। কারখানায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা ব্যবহার করা হয় কিনা, নিবন্ধিত চিকিৎসক ও নার্স আছে কিনা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কিনা, তা-ও দেখা হয়েছে। এছাড়া কারখানার মালিক নিয়মিত কর দেন কিনা, নিয়মিতভাবে বিভিন্ন উপযোগ সেবার বিল পরিশোধ করেন কিনা, এটি দেখা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিরূপণ এবং শ্রমিকদের বিনোদন ও তাদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়া হয় কিনা, এসব বিষয়ও দেখা হয়েছে। ৩০টি পুরস্কারপ্রাপ্ত কারখানার মধ্যে ১৫টি পোশাক কারখানা। সবুজ কারখানা স্থাপনে পোশাক খাত এগিয়ে রয়েছে। অন্যান্য খাতের অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। এক্ষেত্রে পোশাক কারখানার অনুরূপ অন্যান্য শিল্পও সবুজে রূপান্তরের পদক্ষেপ নিতে হবে।

অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে চীনের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য আজ মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এ অবস্থার অবসানে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কার্বন নিঃসরণের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে চীন। ইউরোপে এ ব্যবস্থা অনেক দিন আগে থেকেই রয়েছে। চীনের নীতি অনুযায়ী প্রতি ইউনিটে বায়ুদূষণের জন্য শুল্ক পরিশোধ করতে হবে শিল্প-কারখানাগুলোর। একইভাবে পানিদূষণ, কয়লাভিত্তিক দূষণ এবং প্রতি টন বর্জ্যের কারণে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া শব্দদূষণের কারণেও গুনতে হবে শুল্ক। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এ দেশটির সরকার বায়ুদূষণ কমানো, ফসলি জমি রক্ষা ও পানিদূষণ রোধের ব্যাপক চেষ্টা করেও বারবারই ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে করনীতিতে পরিবর্তন এনে শিল্প-কারখানার ওপর শুল্ক আরোপ করেছে। আমাদের দেশের শিল্পদূষণ রোধে চীনের মতো শুল্ক আরোপের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে শিল্পোন্নয়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু সেই শিল্পকে হতে হবে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব। শিল্পের জন্য কোনো কৃষিজমি বিনষ্ট করা যাবে না। বনভূমি ধ্বংস করা যাবে না। জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা যাবে না। মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দদূষণের মাধ্যমে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জীবন বিপন্ন করে তোলা যাবে না। শিল্পে ব্যবহূত জ্বালানি হবে নবায়নযোগ্য আর উৎপাদিত পণ্যও হবে পরিবেশবান্ধব। শিল্পায়ন সরকারের অগ্রাধিকার হলেও বর্তমান সরকার পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো ধরনের শিল্পায়নের পক্ষে নয়। এজন্য সবুজ শিল্পায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় এরই মধ্যে সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহারকারী শিল্পোদ্যোক্তাদের কর রেয়াতসহ বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন শিল্পনীতিতে পরিবেশবান্ধব শিল্পোদ্যোগের প্রতি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রণোদনা বৃদ্ধির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। এখন প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন। এখানেই দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে, যা কাটিয়ে উঠতে তদারক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

হতাশার বিষয় হলো, বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিল্প-কারখানায় ইটিপি ব্যবহার করা হয় না। শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্য নদী-নালা, খাল-বিলে নিক্ষেপ করা হয়। শিল্পবর্জ্য দ্বারা আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ভবিষ্যতের শিল্প হবে পরিবেশবান্ধব। পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করেই উদ্যোক্তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে বিনিয়োগ করতে হবে। এজন্য শুধু নীতিগত সহায়তাই নয়, সরকারকে আর্থিক সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দিতে হবে। একটি কারখানাকে পরিবেশবান্ধব করে তোলার জন্য এসব শর্তপূরণ নিঃসন্দেহে অনেক চ্যালেঞ্জের। পুরস্কারের মাধ্যমে শর্তগুলো পূরণে উৎসাহিত হবেন শিল্প মালিকরা। এটি শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, শ্রম ও শ্রমিকবান্ধব করে তুলবে কারখানাগুলোকে। আমাদের কারখানাগুলোর পরিবেশ নিয়ে বাইরের দুনিয়ায় যে সমালোচনা আছে, তা ঘোচাতেও এটি সহায়তা করবে বলে প্রত্যাশা।

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -spot_img

সর্বাধিক পঠিত