পরিবেশ রক্ষা এবং ধ্বংস- দু’টিই হচ্ছে সরকারি টাকায়

0
19

কেফায়েত শাকিল

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ঘটা করে সারাদেশে এক কোটি গাছ লাগিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। অপরদিকে একই বছরে সবুজ শূন্য ঢাকার অন্যতম সবুজ এলাকা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সরকারি টাকা খরচ করেই গাছ কেটেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদের মুখে আপাতত স্থগিত রয়েছে রাজধানীর সবুজ এই উদ্যানের বৃক্ষ নিধন।

অপরদিকে, সেন্টমার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সমুদ্র সম্পদের বড় উৎস সেটা সবার জানা। দ্বীপটি রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিনকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। আইন বলছে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রিত থাকবে সব ধরনের উন্নয়ন কাজ ও মানুষের যাতায়াত। নিষেধাজ্ঞা রয়েছে পাকা বাড়িঘর নির্মাণেও। আর তা বাস্তবায়নে বছর বছর কোটি টাকার প্রকল্পও চালাচ্ছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।

অপরদিকে, সরকারি এই সংস্থার নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে একের পর এক ভবন উঠেছে এখানে। সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে এই নিষিদ্ধ এলাকায় ভবন করেছে পর্যটন মন্ত্রণালয়, পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক হোটেল-রিসোর্টও। একে একে পর্যটকবাহী নৌযানেরও অনুমতি দিয়ে যাচ্ছে নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়।

কক্সবাজার জেলারই আরেক ঘটনা। জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর মধ্যে কক্সবাজার অন্যতম একটি। তাই এখানে বৃক্ষরোপনে প্রতিবছর টাকা ঢালছে বন মন্ত্রণালয়। কিন্তু রেল লাইন নির্মাণের জন্য সেই জেলাতেই সংরক্ষিত বন কেটেছে রেলওয়ে। ধ্বংস করেছে অগণিত পাহাড়।

বন অধিদফতরের সবশেষ তথ্য বলছে, এক লাখ ৬০ হাজার একর বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২১ একর বনভূমি।

বন বিভাগের তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি বনভূমি বেদখল হয়েছে কক্সবাজার জেলায়। যার পরিমাণ ৫৯ হাজার ৪৭১ একর।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দ্বিমুখী আচরণের কারণে পরিবেশ ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা। এর জন্য কেন্দ্রীয় সমন্বয়হীনতাকেও দায়ী করেন তারা।

সেন্টমার্টিনের পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সমুদ্র বিষয়ক পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ আওয়ার সি-এর পরিচালক ও মেরিন এক্সপ্লোরার এস এম আতিকুর রহমান বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, সেন্টমার্টিন একদমই ব্যতিক্রমী একটি এলাকা। এখানে যে সম্পদ আছে তা দেশের আর কোথাও নেই। তাই এই স্থানটি রক্ষায় টাকা ঢেলে যাচ্ছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এখন এমন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বাকি নেই যারা এই সেন্টমার্টিনে অন্তত একটা বাংলো করছে না। এগুলো সবই করা হচ্ছে শুধুমাত্র আনন্দ উল্লাসের জন্য। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো একদিকে সরকার সংরক্ষণের জন্য টাকা দিচ্ছে, আরেকদিকে এভাবে পরিবেশ নষ্টের জন্যও সরকারই টাকা দিচ্ছে। এটা একদমই স্ববিরোধী কাজ। এতে সবদিক থেকে জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, পরিবেশবাদীরা যখন সংরক্ষণের কথা বলছেন তখন ট্যুরিজম অথরিটি বোঝাচ্ছে এখানে পর্যটন থেকে প্রচুর আয় হবে। সরকার কখনো আয় ও ব্যয়ের হিসেব করে বলে আমার মনে হয় না। আয় ব্যয়ের হিসেব করলে দেখা যাবে সংরক্ষণ ব্যয়ের তুলনায় আয় খুবই সামান্য। তাহলে কেন পর্যটনের নামে এই স্থানটিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? সরকার আসলে সংরক্ষণ না ধ্বংস চায় সেটা ক্লিয়ার করা দরকার।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংসের চিত্র সারাদেশে বিদ্যমান। বার বার বলছি আমরা উন্নয়নবিরোধী নই। কিন্তু আমরা চাই টেকসই উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে যেখানে যেই উন্নয়ন কাজ পরিবেশ বিধ্বংসী হবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সেটা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, আমরা এখন দেখছি বন মন্ত্রণালয় গাছ লাগাচ্ছে আর অন্য মন্ত্রণালয় উন্নয়নের নামে বড় বড় গাছ কেটে নিচ্ছে। আমরা মনে করি যেখানেই উন্নয়ন হোক না কেন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সংগে সমন্বয় করে করা উচিত। প্রতিটি গাছ কাটার হিসেব তাদের কাছে থাকা উচিত। নইলে সরকার টাকা খরচ করে যাবে কিন্তু মানুষ কোনো সুফল পাবে না।

এই বিষয়ে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)–এর যুগ্ম সম্পাদক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, প্রতিটি উন্নয়ন কাজের পরিকল্পনার সময় আগে পরিবেশগত ক্ষতির জরিপ করার কথা। কিন্তু এখন জরিপ করে উদ্যোগ নেওয়া হয় না। বরং নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে জরিপ করা হয়। ফলে এমপি-মন্ত্রীর ঘোষণার কাছে পরিবেশ জরিপ আর টেকে না। পরিবেশ মন্ত্রণালয় তো জানেই না তাদের কতোটা ক্ষমতা আছে। এই কারণে তারা কখনো অন্য সংস্থার পরিবেশ বিধ্বংসী কাছে বাধাও দেয় না। এভাবেই দেশের পরিবেশ দিনে দিনে নষ্ট হচ্ছে সরকারের টাকাও যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনার আগেই পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। একইসংগে পরিবেশ রক্ষায় কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা প্রয়োজন যার মাধ্যমে সব মন্ত্রণালয়ের পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এজন্য সব স্টেক হোল্ডারের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় পরিবেশ সংরক্ষণ বোর্ড গঠনের পরামর্শ দেন এই পরিবেশবিদ।