পৌরসভায় ক্ষমতা হারাবেন জনপ্রতিনিধিরা

0
16

স্বাধীন নিউজ ডেস্ক।

জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের তিনটি স্তরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা। সর্বোচ্চ স্তরে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি, দ্বিতীয় স্তরে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ এবং তৃতীয় স্তরে স্থানীয় সরকারসমূহ। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকে নানা পর্যায়ে দেশে স্থানীয় সরকারের পরিধি বাড়লেও তাদের ক্ষমতা বাড়েনি। আবার সাম্প্রতিক দশকগুলোতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও আগের তুলনায় আরও বেশি করে দলের লেজুড়বৃত্তিতে যুক্ত।

ফলে এখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরও শোনা যায় না। এই অবস্থার মধ্যেই দেশের প্রথম শ্রেণির ১৯৪ পৌরসভায় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী এ পদে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান তৈরি করা হলেও এতদিন তা কার্যকর করা হয়নি। সরকারি সূত্রের তথ্যানুসারে এখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। গত সপ্তাহে মেহেরপুর ও কক্সবাজার পৌরসভায় সরকারের সহকারী সচিব পদের দুই কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের মোট ৩২৮ পৌরসভার মধ্যে ১৯৪টিতেই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। এটি একটি নতুন চাপ বলে মনে করছেন পৌরসভার অনেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমলাতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতেই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পৌরসভায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এরকম হলে পৌরসভাগুলোর সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগও হয়ে পড়বে ক্যাডার কর্মকর্তাকেন্দ্রিক, নির্বাচিত মেয়ররা এই বলয়ের বাইরে রয়ে যাবেন।

এই পরিস্থিতির জন্য তারা মেয়র-কাউন্সিলদের দলবৃত্তিকেও দায়ী করছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন দলবৃত্তিতে ডুবে থেকে জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কথা না বলায় এখন আমলারা আইনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে পৌরসভা অধ্যাদেশ জারি হয় ১৯৭৭ সালে। সে সময় থেকেই ‘সচিব’ পদের একজন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার মাধ্যমে নির্বাচিত মেয়ররা পৌরসভার দাপ্তরিক কর্মকা- পরিচালনা করে আসছেন। এদিকে, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে আবার ‘সচিব’ পদের অধস্তন বিভিন্ন শাখাপ্রধানের পদমর্যাদা ও বেতনক্রম সচিব পদের সমান করা হয়। এভাবে প্রকৌশলী, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তারা পৌরসভা সচিবের সমপর্যায়ের হয়ে ওঠেন। ফলে কর্তৃত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নেও পৌরসভা প্রশাসনে একটি ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ বর্তমানে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ অনুসারে পৌরসভাগুলো প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এই আইনের জনবল কাঠামোয় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কর্মপরিধি স্পষ্ট করা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পৌরসভার মতো ক্ষুদ্র অধিক্ষেত্রে একই ধরনের ‘সচিব’ ও ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ দুটি পদ রাখার কোনো যৌক্তিকতা বা প্রয়োজনীয়তা নেই। আবার পৌরসভার প্রধান ‘মেয়র’ যেখানে দাপ্তরিক কাঠামোয় নিজেই ‘প্রধান নির্বাহী’, সেখানে একই কাঠামোয় তার অধীন ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ পদের ধারণা অস্বাভাবিক ও অমূলক।

এ তো গেল পৌরসভা প্রশাসনের আইন ও কাঠামোগত জটিলতা। বাস্তবিক অর্থে যে পৌরসভাগুলোকে ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার বানিয়ে রাখা হয়েছে সেটা বোঝা যায় আইন অনুসারে পৌরসভার কাজ আর বাস্তবে তাদের এখতিয়ারের তুলনা করলে। পৌরসভা আইনে নির্ধারিত তৃতীয় স্তরের এই স্থানীয় সরকারের কাজের সংখ্যা ১৭২টি। কিন্তু বাস্তবে পরিচ্ছন্নতা, রাস্তার বাতি ঠিকঠাক রাখা, নতুন রাস্তা তৈরি এবং পুরনো রাস্তা মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণসহ কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন, নর্দমা পরিষ্কার, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, প্রত্যয়নপত্র আর টিআর-কাবিখা বিতরণের মধ্যেই তাদের কাজ সীমাবদ্ধ। আর পৌরসভার আয়-ব্যয়ের অবস্থাও তথৈবচ। এখন সারা দেশে সক্রিয় পৌরসভা আছে ৩২৮টি। সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী এগুলোর মধ্যে ৪০টিতে ১০ থেকে ৬০ মাস পর্যন্ত বেতন-ভাতা বকেয়া। ১ মাস থেকে ৫৯ মাস বেতন-ভাতা বকেয়া ১৭০টি পৌরসভায়। জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়াও এই আর্থিক সংকটের একটি কারণ। আর এই অবস্থাতেই মন্ত্রী ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন পৌরসভাকে নিজের আয়ে চলতে হবে। কর্মীদের ১২ মাসের বেতন দিতে না পারলে পরিষদ ভেঙে দিতে আইন সংশোধন করার হুমকিও দিয়েছেন মন্ত্রী। কিন্তু পৌরসভার মতো স্থানীয় সরকারগুলোকে কেন কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে হয় সেই প্রশ্নের মীমাংসা ছাড়া এই সংকটেরও সমাধান হবে না। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, দেশে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন না হওয়ার অন্যতম কারণ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং উন্নয়ননীতি দুটোই পরিচালিত হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। ফলে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন কাজে বাস্তবিক অর্থে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের খুব বেশি হাত নেই। এই পরিস্থিতির মধ্যেই এখন পৌরসভায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ হিসেবে নিয়োগ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতকে যে আরও দুর্বল করবে তাতে সন্দেহ নেই।