ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসা ঈমানের দাবি

0
36

বরকতময় ও পূণ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃত মজলুম জনপদ ফিলিস্তিন। কুরআনুল কারিমের ৫ স্থানে ফিলিস্তিনকে বরকতময় ও পূণ্যভূমি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সে কারণে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানের একান্ত দাবি।

দখলদার ইসরাইল ইয়াহুদি গোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন ও বোমা-বারূদে মজলুম জনপদ ফিলিস্তিনের বাতাস ভারি হয়ে ওঠেছে। শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ নারী-পুরুষ মরছে। ধ্বংস হচ্ছে দেশটির মুসলমানদের আশ্রয়স্থল। ধ্বংসের পথে মুসলমানদের কেবলা বায়তুল মুকাদ্দাস।

অথচ ফিলিস্তিন ও বায়তুল মুকাদ্দাস রক্ষা করা শধু মুসলিমদের জন্যই নয় বরং যারা নিজেদের আসমানি কিতাবের অনুসারী (ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান) বলে দাবি করছে তাদের একান্ত নৈতিক দায়িত্ব। দখলদার ইসরাইলি ইয়াহুদিরা যেন তা বেমালম ভুলে গেছে।

দলমত নির্বিশেষে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ ফিলিস্তিন, জেরুজালেম এবং বায়তুল মুকাদ্দাস ইস্যুতে একমত। এ পবিত্র স্থানগুলোর অবস্থান মর্যাদা ও সম্মানের। ইসলামের দৃষ্টিকোন থেকেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র, জেরুজালেম ভূখণ্ড, বায়তুল মুকাদ্দাস সংরক্ষণ ও পরিপূর্ণ রক্ষা করা মুসলিম উম্মাহর ওপর আবশ্যক। কারণ কুরআনুল কারিমের এ অঞ্চলের আলোচনা এবং বরকত ও মর্যাদার ঘোষণাই এর প্রমাণ।

ফিলিস্তিন, জেরুজালে ও মসজিদে আকসা সম্পর্কে কুরআন-সুন্নায় যে আলোচনা হয়েছে; তাহলো-

১. প্রিয় নবির স্মৃতি বিজড়িত বরকতময় বায়তুল মুকাদ্দাস
‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দাকে রাত্রে ভ্রমণ করিয়েছিলেন আল-মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ১)

২. সাইয়্যেদুল মুরসালিন উপাধি লাভ
মেরাজের রাত তথা জেরুজালেমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে রাতের ভ্রমণের মাধ্যমে বিশ্বনবি উর্ধ্বাকাশে আল্লাহর সান্নিধ্য পান। উর্ধ্বাকাশে ভ্রমণের আগে বায়তুল মুকাদ্দাসে তিনি সব নবির নামাজের ইমামতি করেন। তারপর তিনি এখান থেকে ঊর্ধ্ব আকাশে ভ্রমণ করেন। সব নবির ইমামতির মাধ্যমে তিনে হয়ে ওঠেন সাইয়্যেদুল মুরসালিন তথা রাসুলদের নেতা।

এ পবিত্র নগরীর গুরুত্ব ও বরকতের কারণে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য নবি-রাসুলদের আবাসভূমি ও সমাধিস্থল থেকেই বিশ্বনবির মেরাজ তথা উর্ধ্বগমনের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। যদি তা না থাকতো তবে আল্লাহ তাআলা চাইলে বিশ্বনবিকে পবিত্র নগরী মক্কা থেকেই উর্ধ্বাকাশের ডেকে নিতে পারতেন।

৩. মুসলিম উম্মাহর প্রথম কেবলা
বায়তুল মুকাদ্দাস। ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত। মুসলমানদের প্রথম কেবলা। যার দিকে ফিরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীর্ঘ ১০ বছর নামাজ আদায় করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তুমি যেখান থেকে বাহির হওনা কেন মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরাও এবং তোমরা যেখানেই থাক না কেন ওর দিকে মুখ ফেরাবে।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৫০)

৪. কুরআনের ঘোষণায় বরকতময় ভূখণ্ড
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমের ৫ স্থানে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে বরকতময় ও পূণ্যময় বলে উল্লেখ করেছেন। তাহলো-
> সুরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে মেরাজের ঘটনা ও বরকতের কথা এভাবে এসেছে-
‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দাকে রাত্রে ভ্রমণ করিয়েছিলেন আল-মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ১)

> ইবরাহিম আলাইহিস সাল্লামের ঘটনা বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘আর আমি তাকে ও লুতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম সেই ভূখণ্ডে(শাম/ফিলিস্তিনে), যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি বিশ্ববাসীর জন্য।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৭১)

> মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘যে সম্প্রদায়কে দুর্বল মনে করা হতো, তাদের আমি আমার কল্যাণপ্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করি; এবং বনি ইসরাইল সমন্ধে আপনার প্রতিপালকের শুভ বাণী সত্যে পরিণত হলো, যেহেতু তারা ধৈর্যধারণ করেছিল।’ (সুরা আরাফ : আয়াত ১৩৭)

> সুলায়মান আলাইহিস সালামের ঘটনায় আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘আর সুলায়মানের বশীভূত করে দিয়েছিলাম উদ্দাম বায়ুকে; সে তার আদেশক্রমে প্রবাহিত হতো সেই ভূখণ্ডের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি; প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমিই সম্যক অবগত।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮১)

> সাবা’র ঘটনায় আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘ওদের ও যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম সেগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং ওইসব জনপদে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করেছিলাম এবং ওদেরকে বলেছিলাম— ‘তোমরা এসব জনপদে নিরাপদে ভ্রমণ কর দিন ও রাতে।’ ( সুরা সাবা : আয়াত ১৮)

কুরআনুল কারিমে উল্লেখিত জনপদের বিবরণ সম্পর্কে তাফসিরে রুহুল মাআনিতে এসেছে- এ বরকতময় অঞ্চল বলতে শামকে বোঝানো হয়েছে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন এ জনপদ হলো বায়তুল মুকাদ্দাস।

কুরআন সুন্নায় বর্ণিত আগের শামদেশ বলতে- বর্তমান সময়ের সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে বোঝানো হয়েছিল।

৫. মর্যাদাপূর্ণ জনপদ ফিলিস্তিন
হাদিসের বর্ণনায় মর্যাদা, সম্মান ও ইবাদতের জন্য ৩টি স্থানকে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ বলা হয়েছে। তাহলো-
– পবিত্র মক্কা নগরী।
– পবিত্র মদিনা নগরী।
– বায়তুল মুকাদ্দাস।

হজরত আবু সাইদ খুদুরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ৩ মসজিদ ব্যতিত অন্য কোনো (স্থানে ইবাদাতের) উদ্দেশ্যে ভ্রমণে বের হওয়া যাবে না। তাহলো- (মক্কার) মসজিদুল হারাম, (ফিলিস্তিন/জেরুজালেমের) মসজিদুল আকসা এবং (মদিনায়) আমার এই মসজিদ।’ (বুখারি ও মুসলিম)

এ স্থানগুলো ইবাদত করার বৈশিষ্ট্য আলাদা। হাদিসের ঘোষণায় এসেছে, ‘মসজিদুল হারাম এবং মসজিদুন নববি ব্যতিত মসজিদুল আকসায় ১ রাকাআত নামাজ আদায় অন্যান্য মসজিদের তুলনায় ৫০০ গুণ বেশি সাওয়াব।’ ((বুখারি, মুসলিম)

কুরআন-সুন্নাহর ঘোষণা ও মর্যাদার বর্ণনায় এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার মতো মুসলিম উম্মাহর জন্য ফিলিস্তিন ভূখণ্ড, জেরুজালেম নগরী ও মসজিদে আকসারি প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসা দেখানো প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানের একান্ত দাবি। আর এ দাবি পালনে তৈরি থাকা ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন ও নির্যাতন বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের সংগ্রামে নিয়োজিত থাকাও একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ঈমানের এ দাবি পূরণে সব সময় সোচ্ছার থাকার তাওফিক দান করুন। মজলুম জনপদ ফিলিস্তিন, জেরুজালেম ও মসজিদে আকসাসহ ওই জনপদের সব মুসলিমকে হেফাজত করুন। আমিন।