বছরে ৬৫ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদার বিপরীতে পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন! 

আফজাল হোসাইন 
বিশেষ প্রতিবেদক, স্বাধীন নিউজ
১৯৬৮ সালে পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) তৈরি করা হয়। যা এখনো দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে আনা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ইআরএল শোধন করে থাকে। এতে উৎপাদিত ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি তেল নেয় বিপিসি।
বছর বছর চাহিদার পরিমাণ বাড়লেও জ্বালানি তেল শোধনক্ষমতা বাড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর বেশি পরিমাণে ডিজেল আমদানি করতে বাড়তি ডলার খরচ করতে হচ্ছে সরকারকে। ১৯৬৮ সালে এই শোধনাগারটি পূর্ব পাকিস্তানের তেলের যোগান সামাল দেওয়ার পরও যাতে বার্মা ও আশপাশের তেলের যোগান দিয়ে অর্থ আয় করতে পারে সেই পরিকল্পনা অনুসারে তৈরি করা হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় ইস্টার্ন রিফাইনারি গত ৫৩ বছরেও তার সক্ষমতা বাড়াতে পারেনি। অন্যদিকে তেলের চাহিদা বেড়েছে বহু বহুগুণ। বাংলাদেশ গত তিপ্পান্ন বছরে আরেকটি তেল শোধানাগার তো তৈরি করতে পারেইনি, ইস্টার্ন রিফাইনারিকেও আপডেট করতে পারেনি।
ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল শোধনের সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। অন্যদিকে বছরে জ্বালানি চাহিদা ৬৫ লাখ টন।  ফলে বিপিসি-কে উচ্চমূল্যে শোধনকৃত ডিজেল কিনতে হয়। শুধু শোধন ক্ষমতা নয় দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, এর মজুদ ক্ষমতাও বাড়ানো হয় নি। ফলে দাম কমের সময় যে একটু বেশি কিনে মজুদ করবে সেই ব্যবস্থাও নেই। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬-২৭ সালে বার্ষিক চাহিদা বেড়ে ৮০ লাখ টনে পৌঁছাবে।
এর মধ্যে সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ২০১২ সালে নেওয়া প্রকল্পটি ১০ বছরেও অনুমোদিত হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২৪ কোটি ডলার সাশ্রয় হতো। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উর্ধতন দুজন কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি তেল পরিশোধনক্ষমতা বাড়াতে ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১২ সালে। এরপর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রকল্পটিকে ১০ বার কাটাছেঁড়া করেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার আগে ঘুরপাক খেয়েছে মন্ত্রণালয়, বিপিসি ও ভারতীয় কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের কাছে। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০১২ সালে যখন পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছিল, তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে ১০ বার সংশোধনের পরে এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, ইআরএল-২ প্রকল্পের আওতায় নতুন পরিশোধনাগারের সক্ষমতা হবে ৩০ লাখ টন। প্রকল্পটি মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে ঠিকাদার নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। ঠিকাদার নিয়োগের পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে শোধনাগারটি স্থাপন করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
বিপিসি ও ইআরএল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পরিশোধনাগারটি নির্মাণ করেছিল টেকনিপ নামের ফ্রান্সের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রস্তাবিত নতুন পরিশোধনাগারটিও তাদের মাধ্যমে করার নীতিগত অনুমোদন দেয় সরকার। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে কারিগরি নকশা তৈরি করতে টেকনিপের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় বিপিসি।
টেকনিপ এই নকশা তৈরি করতে বিপিসির কাছ থেকে তিন বছর সময় নেয়। এই সময়ের মধ্যে টেকনিপ ও বিপিসির মধ্যে প্রকল্পটি নিয়ে সমঝোতা চলে। বিপিসির মতে, টেকনিপ যেসব শর্ত দিয়েছে দেশীয় স্বার্থ রক্ষায় তাদের সব দাবি পূরণ করা যায়নি। বিপিসি কর্মকর্তারা যোগ করেন, পরিশোধনাগার নির্মাণ শেষে চালু করার আগেই দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল টেকনিপ। এমন শর্ত মানতে রাজি নয় বিপিসির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া অন্যান্য কিছু শর্তের বিষয়েও আপত্তি ছিল বিপিসির। এতে কাজটি করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চলে গেছে টেকনিপ।
২০১৮ সালে ইআরএলের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন শীঘ্রই ইআরএল-২ নির্মাণ করা হবে। অথচ এই ঘোষণার ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি আশার আলো দেখেনি।
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -