বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে স্বস্তিতে নেই দ্য ফ্রন্টিয়ার ফান্ড

মেহেদী হাসান রাহাত

তালিকাভুক্ত ও বহির্ভূত—দুই ধরনের কোম্পানিতেই বিনিয়োগের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে ফ্রন্টিয়ার ফান্ড গঠন করে সুইডেনভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স। দেশের প্রথম প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগ (পুঁজিবাজারের তালিকাবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ) হিসেবে কার্যক্রম শুরুর পর বাংলাদেশে এক যুগ সময় অতিবাহিত হয়েছে ফান্ডটির। এ সময়ের মধ্যে নয়টি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে ১২ কোটি ডলার। একটি কোম্পানি থেকে প্রত্যাহারও করে নেয়া হয়েছে। এ বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সের জন্য। তার ওপর প্যারাডাইস পেপারসে নাম আসায় সন্দেহের তীরেও বিদ্ধ হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে নেই ফ্রন্টিয়ার ফান্ড।

দেশে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সের ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স বাংলাদেশ লিমিটেড। দেশের যেসব প্রতিষ্ঠানে ফ্রন্টিয়ার ফান্ডে বিনিয়োগ করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রহিমআফরোজ সুপারস্টোরস লিমিটেড, যা আগোরা নামে পরিচিত। আগোরায় বর্তমানে ফ্রন্টিয়ার ফান্ডে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ শতাংশে। আগোরার মূল উদ্যোক্তা রহিমআফরোজ গ্রুপের পক্ষ থেকে সুপারশপটি জেমকন গ্রুপের কাছে বিক্রির চুক্তি করা হয়েছিল। জেমকনের মালিকানায় মীনা বাজার নামে একটি সুপারশপ রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত জেমকন গ্রুপের কাছে আগোরাকে বিক্রি করে দেয়ার বিষয়টি আর চূড়ান্ত পরিণতি পাচ্ছে না। আগোরাকে বিক্রি করে দিতে বর্তমানে নতুন ক্রেতা খুঁজছেন রহিমআফরোজ গ্রুপ ও ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স বাংলাদেশের কর্মকর্তারা।

রহিমআফরোজ গ্রুপের ব্যাটারি ব্যবসা রহিমআফরোজ গ্লোব্যাট লিমিটেডে ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের ১৭ শতাংশ বিনিয়োগ রয়েছে। কোম্পানিটির ব্যাটারি ব্যবসা বর্তমানে ভালো যাচ্ছে না।

স্থানীয় অটোমেটিভ শিল্পের অন্যতম প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলসে বর্তমানে ব্রামার ফ্রন্টিয়ার পিই ২ (মরিশাস) লিমিটেডের ২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বিনিয়োগ রয়েছে। ২০১৩ সালে তহবিলটি থেকে রানারে ১০৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল। রানার অটোমোবাইলস ২০১৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। নিয়ম অনুযায়ী কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তির পর তিন বছর পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রির ওপর লকইন আরোপ করা থাকে। সে অনুযায়ী, আগামী বছরের আগে নিজের মালিকানায় থাকা রানারের শেয়ারগুলো বিক্রি করতে পারার কথা নয় ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের। তবে এরই মধ্যে এ লকইন থেকে অব্যাহতি চেয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে একটি আবেদন করেছে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স। এ আবেদন এরই মধ্যে মঞ্জুরও হয়েছে। ফলে এখন চাইলেই যেকোনো সময় রানার অটোমোবাইলসের শেয়ার বিক্রিতে বাধা নেই ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের। বর্তমান বাজারদর অনুসারে ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের কাছে থাকা রানারের শেয়ারের দাম ১৫২ কোটি টাকা।

দেশের ইলেকট্রনিক ও অ্যাপ্লায়েন্স বাজারের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান বাটারফ্লাই মার্কেটিং লিমিটেডের ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার রয়েছে ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের হাতে। বাটারফ্লাই প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এখনো পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কাছে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন ও প্রসপেক্টাস জমা দেয়া হয়নি।

এছাড়া ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান অনন্ত অ্যাপারেলস লিমিটেডে ১৪ শতাংশ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস বিক্রয়ডটকমের মূল প্রতিষ্ঠান সল্টসাইট টেকনোলজি এবিতে ৪ শতাংশ, অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার ফাইবার অ্যাট হোমে ১০ শতাংশ ও অনন্ত গ্রুপের ই-কমার্স ভেঞ্চার জিরো গ্র্যাভিটি ভেঞ্চারস লিমিটেডে ৫ শতাংশ বিনিয়োগ রয়েছে।

এখন পর্যন্ত শুধু পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিতে পেরেছে ফ্রন্টিয়ার ফান্ড। ২০১৩ সালে ওষুধ খাতের কোম্পানিটির ২৯ শতাংশ শেয়ারে ১২৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল ব্রামার ফ্রন্টিয়ার পিই (মরিশাস) লিমিটেড। ২০১৯ সালে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য বিডিংয়ের অনুমোদন পেয়েছিল পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস। যদিও বিডিংয়ের অনুমোদন পাওয়ার আট মাসের মাথায় তালিকাভুক্তির আবেদন প্রত্যাহার করে নেয় কোম্পানিটি। আইপিওর মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুযোগ না থাকায় পপুলার ডায়াগনস্টিকের কাছে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের ২৯ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয় ফ্রন্টিয়ার ফান্ড।

প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগের শর্তানুসারে, কোনো কোম্পানি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আইপিওতে আসতে না পারলে সেক্ষেত্রে প্রথমে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির উদ্যোক্তাদের কাছে প্রাইভেট ইকুইটির শেয়ার কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিতে হয়। যদি তারা যৌক্তিক মূল্যে শেয়ার কিনে নেয় তাহলে আর তৃতীয় কোনো কৌশলগত অংশীদারের কাছে শেয়ার বিক্রির প্রয়োজন পড়ে না। তবে যদি বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা শেয়ার কিনে নিতে রাজি না থাকেন, সেক্ষেত্রে প্রাইভেট ইকুইটি লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অংশীদারদের কাছে শেয়ার বিক্রির সুযোগ থাকে। এক্ষেত্রে কৌশলগত অংশীদারের কাছে শেয়ার বিক্রির জন্য নির্ধারিত দরে প্রথমে বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের কাছে শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব দেয়া হয়। তারা রাজি না হলে তখন তৃতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কৌশলগত বিনিয়োগকারীর কাছে শেয়ার বিক্রি করা হয়। পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পপুলার ডায়াগনস্টিক ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের কাছ থেকে কোম্পানিটির শেয়ার কিনে নেয়ায় প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ডটিকে তৃতীয় কোনো পক্ষের দ্বারস্থ হতে হয়নি।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের আট বছরের মাথায় ২০১৭ সালে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সকে বিতর্কের মুখে পড়তে হয়। সে সময় বিশ্বব্যাপী ফাঁস হওয়া প্যারাডাইস পেপারসে ফ্রন্টিয়ার ফান্ড ও ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেডের নাম উঠে আসে। প্রতিষ্ঠানটি করস্বর্গ বারমুডায় নিবন্ধিত ফ্রন্টিয়ার ফান্ড লিমিটেডের শেয়ারহোল্ডার। ফাঁস হওয়া তথ্যানুসারে ফ্রন্টিয়ার ফান্ড গঠন হয়েছে ২০০৮ সালের ৩ জুন। ফান্ডটির ক্লোজিং হয়েছে ২০১৪ সালের ৭ অক্টোবর। প্যারাডাইস পেপারে ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ (বারমুডা) লিমিটেড নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে, যেটি ২০১১ সালের ১৫ এপ্রিল বারমুডায় ইনকরপোরেটেড হয় এবং ক্লোজিং হয় ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল। ফ্রন্টিয়ার ফান্ড (বারমুডা) লিমিটেড ও ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ (বারমুডা) লিমিটেডের শেয়ারহোল্ডার হচ্ছে বিঅ্যান্ডপি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বারমুডা) লিমিটেড, যেটি ২০০৩ সালের ১২ মার্চ বারমুডায় নিবন্ধিত সুইডিশ প্রতিষ্ঠান। সবগুলো প্রতিষ্ঠানই ব্রামার গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতের কাছে অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। এ তালিকায় ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেডের নামও রয়েছে। দুদকের তদন্তে যদি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে দেশে ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের বিনিয়োগ ও অর্থ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া আরো জটিলতার সম্মুখীন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিক বিষয়ে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালক ও মুখ্য উপদেষ্টা মুয়াল্লেম এ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলেই এখানে প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগ করা হয়েছিল। দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে বিনিয়োগ করা অর্থ যাতে সহজেই আবার ফেরত নেয়া যায়, সে ধরনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যেসব সুবিধা দিচ্ছে, আমাদের তার চেয়ে বেশি দিতে হবে। তাহলেই বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে। আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, লকইন পিরিয়ড, দ্বৈত কর, বিনিয়োগের অর্থ প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে বেশকিছু জটিলতা তো রয়েছেই। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে প্রাইভেট ইকুইটি হিসেবে বিনিয়োগকৃত অর্থ বিনিয়োগকারীরা ফেরত নিয়ে যাবেন, এটিই স্বাভাবিক। এ ফান্ডের অর্থ আবারো এখানে বিনিয়োগ করা হবে কিনা, সেটি তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। তারা যেখানেই ভালো রিটার্ন পাবেন, সেখানেই অর্থ বিনিয়োগ করবেন।

ফ্রন্টিয়ার ফান্ড সিডিসি, নরফান্ড, এফএমও, আইএফসির মতো উন্নয়ন-সহযোগীদের পাশাপাশি সুইডেনের বাণিজ্যিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও তহবিল সংগ্রহ করেছে। বাংলাদেশে প্রাইভেট ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রিত হয় বিএসইসির বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল বিধিমালার মাধ্যমে। দেশের সম্ভাবনাময় ব্যবসায় উদ্যোগকে প্রাইভেট ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাধ্যমে আর্থিকভাবে সহায়তা করার লক্ষ্যে এ বিধিমালা করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, প্রাইভেট ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালকে আমরা সবসময়ই উৎসাহিত করি। প্রাইভেট ইকুইটিতে বেশি রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ থাকায় এক্ষেত্রে ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি থাকে। আইপিওর মাধ্যমে সহজেই প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা সম্ভব। আমরা বর্তমানে আইপি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অনেক কমিয়ে এনেছি। কিন্তু আইপিওতে না এলে সেক্ষেত্রে প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে আমাদের করার কিছু থাকে না। তবে আমরা অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) গঠন করছি। এটি হয়ে গেলে সেখানে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের সুযোগ থাকবে। তখন এ প্লাটফর্ম প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগবে।

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর

মুদ্রার বিনিময় হার:

- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -