বাঙালির গৌরবের মাস ডিসেম্বর

 

এম. আবুল ফয়েজ মামুন 

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বীর বাঙালি বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। দেখতে দেখতে আমরা পেরিয়ে এলাম ৫০ টি বছর। বছর ঘুরে আবার এলো বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে দিনটি বিশেষ ভাবে পালিত হয়। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই দিনটিকে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয় এবং সরকারিভাবে এই দিনটি ছুটি ঘোষণা করা হয়। আমরা যে আজ বিজয় দিবস উদযাপন করছি তা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সময় যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী বীরদের বীরত্বের কারণেই সম্ভবপর হয়ে উঠেছে। তাই পরলোকগত ও জীবিত সকল মুক্তিযুদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। স্বাধীনতাকামী বাঙালির হৃদয়ে মাসটি মহা আনন্দের, মহা গৌরবের, অপার্থিব সৌরভের, একইসঙ্গে শোকেরও। দ্বি জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও তা যে টিকবে না তা আঁচ করেছিলেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তারপর নিপীড়ন-নির্যাতন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বাধিকার এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কে প্রবল করে তোলে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বাধিকার এর চাওয়াকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা ১৯৭১ সালে অস্ত্রের মুখে রুদ্ধ করতে প্রয়াস চালিয়ে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের উপর। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও বাঙালির স্বাধীনতার রক্তলাল সূর্যদয়ের ভিত্তি সূচিত হয়েছিল বেশ আগেই। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে উদ্দীপ্ত বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জনের দৃঢ় শপথ নিয়েছিল। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নির্মম নৃশংস হত্যাকান্ডের পর বাংলার দামাল ছেলেরা রুখে দাঁড়িয়েছিল শোষণের বিরুদ্ধে। এরপর টানা ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর আত্মদানের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেল চারটা ২১ মিনিটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৯১,৬৩৪ সদস্য বাংলাদেশ ও ভারতের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। ১৬ ডিসেম্বর এই দিনটিই আমাদের বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির জীবনের পরম আরোধ্যের বিষয়। এই দিনটি অর্জনের জন্য আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। আর প্রত্যেকটি ধাপে বাঙালি জাতি তাদের দেশপ্রেম এর সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরুস্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধে জয়লাভ প্রত্যেকটি সংগ্রামে বাঙালি জাতি তাদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে এবং যার সামষ্টিক পরিণতি আমাদের আজকের বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যায়িত করে যারা অপমান করেছিল।সেই তাদের কন্ঠেই এখন বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা। দারিদ্র্য আর দুর্যোগের বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি,স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ আর্থসামাজিক প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। সেই অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। বাঙালি হিসেবে প্রত্যেকেরই এই দেশের প্রতি কিছু কর্তব্য রয়েছে। কেবল বিজয় দিবসের একটি দিনেই নয়, একটি মাসেই নয় বরং বিজয়ের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে প্রত্যেক বাঙালির উচিত সারা বছরই দেশ-জাতি,স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে কাজ করে যাওয়া। বিজয়ের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রচারে জাতীয়ভাবে উদ্যেগ গ্রহন করতে হবে। যারা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিজয়ের ইতিহাস বিকৃত করে পরবর্তী প্রজন্মকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে সচেষ্ট তাদেরকে চিহ্নিত করে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযত পদক্ষেপ নেওয়া বাঙালির জাতীয় কর্তব্য। বাঙালি জাতি যতদিন বেঁচে থাকবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গৌরব করবে,অহংকার করবে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং শ্রেণি বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠনই হোক বিজয়ের মাসের শিক্ষা।

লেখকঃ সাহিত্য ও সমাজকর্মী

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -