বিলুপ্তির পথে কাঠ শালিক

জেলা প্রতিনিধি | নওগাঁ

মাঝারি আকারের বৃক্ষচর পাখি শালিক। গ্রাম-বাংলার অতি চেনা শালিক পাখিদের মধ্যে অন্যতম ‘কাঠ শালিক’। দেশমাতৃকার এই সৌন্দর্যের একটা বড় জায়গাজুড়ে রয়েছে চিরচেনা শত শত পাখি। কিন্তু অবাধ বৃক্ষ নিধন, জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ ও শিকারিদের দৌরাত্ম্যে অনেক পাখির অস্তিত্ব আজ বিলুপ্তির পথে। সম্প্রতি নওগাঁ সদর উপজেলার বক্তারপুর গ্রাম থেকে এমন একটি পাখির ছবি তুলেছেন ফটোগ্রাফার শামীনূর রহমান।

বাংলাদেশে শালিক প্রজাতির পাখির মধ্যে রয়েছে- কাঠ শালিক, ভাত শালিক, ঝুটি শালিক, গো শালিক, চিত্রা শালিক, গোলাপী শালিক, বামন বা শঙ্খ শালিক এবং ময়না।

কাঠ শালিকের মাথা, পিঠ, লেজ ধূসর রূপালী রংয়ের। গলার নিচ থেকে বুক ও লেজের গোড়া পর্যন্ত হালকা খয়েরি রংয়ের। গলায় রয়েছে মালার মতো অতিরিক্ত ধূসর পালক। উজ্জ্বল বড় বড় চোখ ও পা লালচে বর্ণের হয়। চোখে ধূসর বৃত্তের মাঝখানে কালো ফোঁটা। ঠোঁটের গোড়ার অংশটি সুরমা ও আগার অংশ হলুদ বর্ণের। এরা দলবদ্ধ ভাবে থাকে এবং লাজুক স্বভাবের। মানুষের কাছাকাছি কম ঘেঁসে। এরা গাছের কোটরে গর্ত করে বাসা বানায়।

এরা বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট শালিক। পাখিটি সাধারণত ১৯ থেকে ২১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। প্রজনন এবং ছানা লালন-পালনের জন্য গাছের কোটরে বাসা বানায়। বসন্তের শুরু থেকে বর্ষা পর্যন্ত এদের প্রজনন ও ছানা লালন পালনের মৌসুম। এসময় মা পাখি ৩-৪ টি ছোট লম্বাটে হালকা নীল রঙের ডিম পাড়ে।

ছানা বড় হয়ে উড়তে শিখলে আবারও বাসা ছেড়ে চলে যায়। ফিরে আসে পরের প্রজনন মৌসুমে। ছোট ছোট পোকামাকড়, ফল রয়েছে এদের খাদ্য তালিকায়। কাঠ শালিক দম্পতি অন্য পাখির আক্রমণ থেকে তাদের ছানাদের রক্ষায় সদা সতর্ক। পরিবেশবান্ধব সুন্দর এ পাখিটি সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।

প্রকৃতি নিয়ে ছবি উঠাতে ভালোবাসেন ফটোগ্রাফার শামীনূর রহমান। তিনি বলেন, সুন্দর এই পাখিটির সংখ্যা প্রতিনিয়তই কমে যাচ্ছে। আগে এদের সর্বত্র দেখা যেত। মফস্বল গ্রামগুলোতেও এদের বিচরণ আর আগের মতো পরিলক্ষিত হয় না। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই সুন্দর পাখিটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

মহাদেবপুর প্রাণ ও প্রকৃতি সংগঠনের সভাপতি কাজী নাজমুল হোসেন বলেন, এক সময় প্রচুর খেকশিয়াল দেখা যেত। কিন্তু এখন আর তেমন চোখে পড়ে না বললেই চলে। এর একটাই কারণ প্রকৃতিতে বন জঙ্গল কমে যাচ্ছে। তেমনি কাঠ শালিক পাখিও প্রকৃতিতে দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে যে কয়েকটি দেখা যাচ্ছে এক বছর বা পাঁচ বছর পর হয়ত আর দেখা যাবে না।

তাদের খাদ্য ও আবাসস্থল সংকট এবং পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিলে প্রকৃতিতে তারা নিজেদের মিলিয়ে নিতে পারে না। তারা যে পোকামাকড় খায় ফসলি জমিতে কীটনাশক দেওয়ায় সেসব খাদ্য তারা পাচ্ছে না। এছাড়া প্রকৃতিতে গাছপালা কমে যাওয়ায় তাদের আবাসস্থল কমে যাচ্ছে। এজন্য পরিবেশবাদীদের পাশাপাশি দেশের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং শিকারিদের প্রতিরোধ করতে হবে।

নওগাঁর মহাদেবপুর জীব বৈচিত্র, বন্যপ্রাণী ও নদী সংরক্ষণ (জীবন) সংগঠনের সভাপতি ইউনুসার রহমান হেফজুল বলেন, কাঠ শালিক এক সময় প্রকৃতিতে অনেক দেখা মিলতো। প্রকৃতিতে এখন খুবই কম দেখা মিলছে। প্রতিনিয়ত গাছপালা ও জঙ্গল কমে যাচ্ছে। ফসলি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করায় কীটপতঙ্গ কমে যাচ্ছে। কীটনাশক যুক্ত কীটপতঙ্গ খাওয়ায় তাদের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ প্রজাতিকে প্রকৃতিতে আবারও ফিরিয়ে আনতে হলে বনবিভাগ বা সরকারি ভাবে এদের প্রজনন করে প্রকৃতিতে ছেড়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ফেডারেশনের সভাপতি ও টাঙ্গাইল সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম ইকবাল বলেন, প্রকৃতিগতভাবে কাঠ শালিক সুন্দর ও দূর্লভ প্রজাতির পাখি। যেহেতু কীটপতঙ্গ ও ফল এদের প্রধান খাদ্য। ফলের গাছে কীটনাশক প্রয়োগ করায় তাদের পাকিস্থলি সমস্যা হয়। এতে করে স্বাভাবিকভাবে তাদের যে আয়ুস্কাল তার আগেই পাখিগুলো মারা পড়ছে। এছাড়া পাখিগুলোর নিজেদের কোনো বাসা নেই। কাঠ শালিক প্রজননের সময় অন্য পাখির বাসায় ডিম দেয়। পুরনো ও বড় গাছ এবং জঙ্গল কেটে ফেলায় তারা আশ্রয় হারাচ্ছে। এসব কারণে পাখিগুলো দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে।

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -