বিশ্বে কেমন মুদ্রা আসতে চলেছে?-বিশ্বজুড়ে রয়েছে ১৩০০ ট্রিলিয়ন পয়সা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক নিউজ!

পৃথিবীতে অ্যালকোহল, ড্রাগস সহ যত নেশা দ্রব্য জিনিস আছে তার মধ্যে পয়সা শ্রেষ্ঠ। পয়সা উপার্জনের নেশার কাছে বাকী সমস্ত নেশা জাত দ্রব্য গৌন। পয়সা বা টাকা এমন একটি জিনিস যাকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ সন্তষ্ট হতে পারেনি কিন্তু সমাজের প্রতিস্তরের মানুষ এর পেছনে ছুটে চলেছে। পয়সা শুধু কাগজ বা ধাতুর টুকরো নয়, পয়সা এমনই একটি জিনিস যা মানব সমাজকে শিকারি বানিয়ে দিয়েছে।

জঙ্গলে বসবাস করা মানুষ আজ প্রাসাদে থাকছে এই পয়সার কারনেই। প্রতিটি মানুষ দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছে ধন উপার্জনের জন্য, তারপর সেই উপার্জিত পয়সা দিয়ে সে সুখ সামগ্রী কেনে এবং যার কাছে সেই পয়সা যায় সেও সেই টাকা দিয়ে কিছু কেনে, আদতে পয়সা কারও কাছেই স্থায়ী নয় বরং এটি আবর্তিত হয়।

একটি তথ্য অনুযায়ী এই মহূর্তে বিশ্বে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন পয়সা আছে কিন্তু এটাও বলা হয় আরও অতিরিক্ত ১৩০০ ট্রিলিয়ন পয়সা রয়েছে বিশ্বজুড়ে। এত পয়সা এল কি করে? পয়সা তৈরি হলই বা কেমন করে! সোনা, রূপো থেকে শুরু করে কাগজ সহ কত ধরনের পয়সা আছে বিশ্বে? ভবিষ্যতে কেমন মুদ্রা আসতে পারে? সেসম্পর্কেই বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। সাথে এটাও বলা হবে কি করে এই নির্জীব বস্ত মানুষকে তার গেলাম বানিয়ে ফেলল?

সময়টা আজ থেকে প্রায় ১৭০০০ সাল আগের, তখন বিশ্বে পয়সা বলে কোন বস্তু ছিলনা। মানুষ তখন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বাস করত এদের ট্রাইব বলা হত। তখনকার মানুষের একটাই কাজ ছিল শিকার করে কোনরকমে বেঁচে থাকা।

কিন্তু শিকার প্রতিদন পাওয়া যেতনা, ফলে ক্ষিদের জ্বালায় একটি ট্রাইব আরেকটি ট্রাইবের উপর আক্রমন করত। কিন্তু এভাবে বারবার খাবার জোগার করা সম্ভব ছিলনা কারন এতে বহু মানুষের মৃত্যু হত। তখন শুরু হয় বিনিময় প্রথা অর্থাৎ একটি ট্রাইবের মানুষ অন্য ট্রাইবকে অস্ত্র সরবরাহ করত বিনিময়ে তাদের থেকে খাদ্যদ্রব্য নিত, এভাবে উভয়পক্ষই লাভবান হত।

বলা হয় বিনিময় প্রথা মেসোপোটেমিয়ান মানুষরা প্রথম শুরু করেছিল। দক্ষিন পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত ইরাককেই অতীতে মেসোপোটেমিয়া বলা হতো। বিনিময় প্রথা মানব সমাজকে পুরো বদলে দিয়েছিল, নিজেদের মধ্যে লড়াই ছেড়ে মানুষ ব্যাবসায় মেতে উঠেছিল। ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে এবং মানুষ শিকারের পাশাপাশি কৃষিকাজ শুরু করে। তখন বিনিময় প্রথায় সমস্যা দেখা দেয় কারন এত মানুষের সাথে বিনিময়ে হিসাব রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে। তখন তৈরি হয় হিসাব পদ্ধতি।

মাটির ছোট টুকরোর উপর হিসাব লেখা হত। তবে বিনিময় প্রথায় আরও বড় সমস্যা দেখা যায় যে কেউ কারও থেকে কোন জিনিস কিনতে চায় কিন্তু ক্রেতা যে জিনিসের বিনিময়ে কিনতে চায় বিক্রেতার সে জিনিস দরকার নেই। অবশেষে ২৫০০ বিসিতে(BCE) ঠিক হয় বিনিময় প্রথার ক্ষেত্রে সবকিছু ব্যবহার করা হবে গৃহপালিত পশু থেকে শুরু করে ছুরি, কাটারি, ধাতব বাসনপত্র, মাটির খেলনা, শস্য এমনকী ক্রীতদাস হিসাবে মানুষের বিনিময়েও ব্যবসা চলত।

ইয়াপ দ্বীপে পাঁচটন ওজনের বিশাল পাথরের মাধ্যমেও বিনিময় হত, এই পাথর গুলোকে রাই স্টোন বলা হত। কিন্তু এই পদ্ধতিরও একটি সমস্যা ছিল কারন কেউ যে জিনিসের মাধ্যমে বিনিময় করছে সেই জিনিসের প্রকৃত দাম ঠিক করা মুশকিল ছিল, গৃহপালিত পশু ও শস্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর অকেজো হয়ে পড়ত সেজন্য মানুষের দরকার হয়ে পড়ে বিনিময়ের এমন কিছু মাধ্যম যা জিনিসের দাম নির্দিষ্ট করবে উপরন্তু বহু বছর টিকবে।

৬০০ বিসিই(খ্রিষ্টপূর্বাব্দে) বা আজ থেকে প্রায় ২৬০০ বছর আগে প্রাচীন গ্রীসে সোনা ও রূপোকে মিশিয়ে মানব ইতিহাসে প্রথম মুদ্রা তৈরি হয়েছিল যার উপর সিংহ ও ষাঁড়ের ছবি ছিল, একে লাইডিয়ান স্টেটার বলা হত। সারাদিন পরিশ্রমের পর প্রত্যেককে দুটি করে মুদ্রা দেওয়া হত যা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাও মুশকিল ছিল।

তবে বলা হয় আজ থেকে প্রায় ১০০০ বিসিই আগে তামা ও পিতলের মুদ্রা প্রথম চালু করেছিল চাইনিজরা কিন্তু তার ব্যাপক আকারে ব্যবহার ছিলনা। লাইডিয়ান স্টেটারের পর গোটা বিশ্বে মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এই পদ্ধতিরও সমস্যা দেখা যায়৷

সেসময় জাহাজে করে বিভিন্ন দেশে বানিজ্য হত মুদ্রার মাধ্যমে। ব্যাপক আকারে মুদ্রার ব্যাবহারে জাহাজে মুদ্রার ওজন অনেক বেড়ে যায় এবং চুরির আশঙ্কা দেখা যায়৷ তার উপর এত মুদ্রা গোনাও সম্ভব ছিলান সুতরাং এর বিকল্প হালকা কিছু ব্যাবস্থার দরকার হয়ে পড়ে।

অবশেষে ১২৭৯ সালে চীন মঙ্গোলিয়ার বাদশা চেঙ্গিস খানের নাতি কুবলা খান বার্ক গাছের পাতা দিয়ে বিশ্বের প্রথম নোট তৈরি করে। তবে প্রথমদিকে তার এই নোটের বিরোধীতা করেছিল কিছু মানুষ কিন্তু তাদের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছিল। এরপর চীন ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বেই জনপ্রিয় বিনিময়ের বস্ত হয়ে ওঠে এই নোট সিস্টেম। এর ফলে বিশ্বে বানিজ্যের পরিমান আরও বৃদ্ধি পায়।

এই নোট বা কাগজের পয়সাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ব্যাঙ্কিং সিস্টেম। ব্যাঙ্ক সেসময় মানুষকে তাদের সোনার মুদ্রা জমা রাখার বিনিময় হিসাবে এই কাগজের নোট দিত। ব্যাঙ্ক তাদের বলত তাদের সোনার মুদ্রা ব্যাঙ্কে রইল তারা যখন খুশি এসে নিতে পারে। মানুষও সোনার মুদ্রা চুরি হবার ভয়ে ব্যাঙ্কে মুদ্রা রেখে কাগজের মুদ্রা নিত।

কিন্তু কাগজের মুদ্রার সবচেয়ে বাজে দিক হল এটা যতখুশি ছাপানো যেত, এর ফলে একটা সময় শহর জুড়ে মানুষের হাতে প্রচুর নোট চলে আসে ফলে দেখা যায় মুদ্রাস্ফীতি। অর্থাৎ ব্যাঙ্কের কাছে যত সোনার মুদ্রা জমা ছিল তার থেকেও বেশী কাগজের মুদ্রা মানুষের কাছে ছিল ফলে ব্যাঙ্ক দেওলিয়া হয়ে যায় এবং ব্যাঙ্কের উপর থেকে মানুষের ভরসা উঠে যায়, মানুষজন ঘরেই মু্দ্রা লুকিয়ে রাখতে শুরু করে। অবশেষে ১৮১৬ সালে ব্রিটেন আধুনিক অর্থব্যাবস্থার সূচনা করে।

ব্রিটেন একটি আইন তৈরি করে যে তাদের কাছে যতটুকু সোনা আছে সেই হিসাবেই নোট ছাপাবে তারা এবং মানুষক ঋন দেওয়াও হবে একটি নির্দিষ্ট হিসাবে। এভাবে গোটা ব্রিটেনে এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং ১৯০০ সালে আমেরিকাও এই পদ্ধতি গ্রহন করে। নোট বেশী হলে কোন দেশে মুদ্রাস্ফীতি শুরু হয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় আবার নোট কম থাকলেও দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, ঠিক এমনটাই হয়েছিল আমেরিকায় ১৯৩০ সালে একে গ্রেট ডিপ্রেশন বলা হয়।

মানুষের কাছে কাজ, পয়সা কিছুই ছিল না কিন্তু জিনিসপত্রের দামও কম ছিলনা। এমন অবস্থায় আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ১৯৩৩ সালে সোনা ও ডলারের চুক্তি ভেঙে দেয়। ফলে ব্যাঙ্ক ইচ্ছেমতো ডলার ছাপাতে শুরু করে। আমেরিকা একটি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তৈরি করে যাতে দেশে নোটের যোগান বজায় থাকে প্রয়োজন অনুসারে না বেশী না কম। এতে মানুষের কাছে পয়সা তো আসে কিন্তু এই পয়সা শুধুই কাগজের হয়ে থাকে কারন আগে নোট দিয়ে সোনা পাওয়া যেত এখন এর কোন মূল্য থাকে না।

একে ফিয়েট মানি বলা হয়, শুধু আমেরিকা নয় ভারত সহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের টাকাই ফিয়েট মানি। কাগজের নোটের মাধ্যমে মানুষের জীবন আরও সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু এখানেও সমস্যা তৈরি হয় এটি হালকা, গুনতে সুবিধা তবে অনেক বেশী লেনদেনে বিপুল পরিমান টাকা বয়ে নিয়ে যাওয়ায় ঝামেলা দেখা যায় তখন ১৯৮০ সালে বিশ্বে শুরু হয় ই মানি বা ডিজিট্যাল নোট।

 আজকের ইউপিআই সিস্টেম, ডেবিট, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডে বিপুল লেনদেন সম্ভব, ফলে ব্যাঙ্কেও টাকা কম ছাপতে হচ্ছে। কিন্তু সব সিস্টেমেরই একটি সমস্যা আছে, ঠিক তেমনি ডিজিট্যাল সিস্টেমের সমস্যা হচ্ছে হ্যাকিং, যদিও এই পদ্ধতি খুবই জটিল তবে অসম্ভব নয়।

এর জন্য ২০০৯ সালে বিশ্বে এমন একটি ডিজিট্যাল মুদ্রা আসে যাকে হ্যাক করাই অসম্ভব, এরনাম বিটকয়েন। এটি কোন ফিয়েট মানি নয় এমনকী এর উপর কোন দেশের সরকারেরও কোন হাত নেই। এই কয়েন তৈরি করেছে সাতোশি নাকামোটো, আমরা শুধু এটুকুই জানি এর সম্পর্কে। বিটকয়েনকে বিভিন্ন দেশের সরকার অবৈধ ঘোষনা করেছে কারন এর মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন প্রচুর হয়।

বিটকয়েনে লেনদেন হয় ব্লকচেন টেকনোলজির মাধ্যমে যা ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের থেকে অনেক এগিয়ে। একটি বিটকয়েন হ্যাক করতে একহাজার সালেরও বেশী সময় লাগতে পারে। বর্তমানে একটি বিটকয়েনের দাম ভারতীয় মুদ্রায় ১৪ লাখ টাকা। তবে খুব শীঘ্রই বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব ডিজিট্যাল মুদ্রা আনতে চলেছে যা বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থায় গতি আনবে।

সুত্র>> theindianvoice

এই ওয়েবসাইটের সকল লেখার দায়ভার লেখকের নিজের, স্বাধীন নিউজ কতৃপক্ষ প্রকাশিত লেখার দায়ভার বহন করে না।
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -