বেকারত্ব : স্বপ্নভঙ্গের আরেক নাম

0
41

শাহানা হুদা রঞ্জনা

যুক্তরাষ্ট্রে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করেছে। কিন্তু অনেক কর্মী কাজে ফিরে যেতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। কারণ সরকারের দেওয়া করোনাকালীন বেকার ভাতা থেকে সাপ্তাহিক যে অর্থ পাওয়া যায়, অনেক জায়গায় কাজ করলেও এমন অর্থ উপার্জন করা সম্ভব নয়। তাই অনেক নাগরিক কাজে ফিরে যেতে চাইছেন না। অথচ বাংলাদেশে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। আমাদের তরুণেরা কোনো আর্থিক প্রণোদনা চান না। শুধু চাইছেন করোনার কারণে তাদের জীবন থেকে যে দুটি বছর হারিয়ে গেছে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার একটা সুযোগ।

প্রায় আড়াই কোটি মানুষ পা ফসকে নিন্ম মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র হয়ে গেছে করোনাকালে। ছোট ছোট উদ্যোক্তা, শ্রমিক, চাকুরীজীবী, শিক্ষক, প্রবাসী শ্রমিক কাজ হারিয়ে পথে বসেছেন।
এই যৌক্তিক দাবি আদায়ে তারা চাইছেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ বছর করা হোক। তরুণরা এই প্ল্যাটফর্মের নাম দিয়েছেন চাকরি প্রত্যাশী যুব প্রজন্ম। এখানে যারা নাম লেখাতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই সম্পূর্ণ বেকার। পাস করে বসে আছেন। খুব অল্প সংখ্যক ছেলেমেয়ে ছোট ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন। কৃষিতেও মনোযোগ দিয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু ব্যাপক সংখ্যক চাকরির জন্য বসে আছেন।

এদের অধিকাংশের অবস্থা কিশোরগঞ্জের গ্রামের ছেলে জাফর আহমেদের মতো। নিজের চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন। ঢাকায় টিউশনি করে নিজে চলতেন, বাবা মাকেও টাকা পাঠাতেন। গ্রামে তিনটা ছোট বোন পড়াশোনা করছে। জাফর স্বপ্ন দেখতেন পাস করে একটা চাকরি করবেন এবং পরিবারের অভাব দূর করবেন।

কিন্তু করোনা এসে সব স্বপ্ন ভেঙে দিল। এমনকি ঢাকার মেসে থাকা, টিউশনি সব বন্ধ হয়ে গেল। গ্রামে বোনদের স্কুল বন্ধ। বাবা বারবার জোর করছেন বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার জন্য। কারণ বোনদেরও বেকার সময় নষ্ট হচ্ছে। প্রায় অর্থশূন্য অবস্থায়, অর্থহীন সময় কাটাচ্ছে জাফর। কোথাও কোনো আলো দেখতে পারছে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বিউটি শুধু অপেক্ষায় ছিল এমএ পরীক্ষাটা দিয়ে চাকরির জন্য প্রতিযোগিতায় নামবে। কিন্তু তা আর হচ্ছে কোথায়? পরীক্ষা বন্ধ, চাকরির বাজার বন্ধ, টিউশনিও বন্ধ। চারিদিকে শুধু হতাশা। বাসায় একমাত্র চিন্তা বিউটিকে বিয়ে দেওয়ার।

এখানে যে দু’জনের কথা উল্লেখ করা হলো এরাই এদেশের তরুণ বেকারদের দুই সদস্য। প্রতিবছর শ্রমবাজারে ওদের মতো ২১/২২ লাখ তরুণ-তরুণী প্রবেশ করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, সরকারি চাকরি পান মাত্র ৩.৮ শতাংশ, বেসরকারি চাকরি পান ১৪.২ শতাংশ।

ব্যক্তিমালিকানাধীন ও অন্যান্য খাতে চাকরি পান যথাক্রমে ৬০.০৯ ও ২১.০১ শতাংশ। এই পুরো সংখ্যাটাই এখন কর্মহীন সময় কাটাচ্ছে। শুধু এরাই নয়, যারা বিউটির মতো অনার্স-মাস্টার্স দেওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, তারাও এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাই ২১ মাস ছাড় দিয়ে নয়, সবার জন্য চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা দুই বছর বাড়াতে হবে।

চাকরি প্রত্যাশী যুব প্রজন্ম শুধু এই দাবিটুকু জানিয়েই যাচ্ছে নানাভাবে। কিন্তু সরকারের এই সংক্রান্ত কোনো উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা চোখে পড়ছে না। চলতি বাজেটে এই খাতে কোনো ব্যয় ধরা হয়নি। বরাদ্দ রাখা হয়নি নতুন বেকার হওয়া মানুষগুলোর জন্য।

এই নতুন বেকারের সংখ্যাও তো কম না। প্রায় আড়াই কোটি মানুষ পা ফসকে নিন্ম মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র হয়ে গেছে করোনাকালে। ছোট ছোট উদ্যোক্তা, শ্রমিক, চাকুরীজীবী, শিক্ষক, প্রবাসী শ্রমিক কাজ হারিয়ে পথে বসেছেন। এরাও বেকার হয়ে গেলেন। একজন মানুষ বেকার হওয়া মানে তার পুরো পরিবার বাস্তুচুত হওয়া।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলেছে, করোনা মহামারির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে এই তরুণ প্রজন্ম, কারণ এই তরুণদের ২৫% বেকার।
ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক সমীক্ষা বলছে, করোনার কারণে দেশের অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে (এমএসএমই) কর্মরত ৩৭ শতাংশ মানুষ বেকার হয়েছেন। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। প্রায় দুই কোটি নারী-পুরুষ এই খাতে কাজ করেন। (সূত্র: প্রথম আলো)

সবচেয়ে আশঙ্কার ব্যাপার হলো, এই যে মহামারির কারণে তরুণরা বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়েছেন, ফলে তাদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। এই গ্রুপের সাথে যদি কথা বলা যায়, তাহলে স্পষ্টতই বোঝা যাবে কতখানি হতাশ তারা। সচ্ছল, মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র যেকোনো পরিবারের কর্ম উপযোগী সন্তানদের মধ্যে তীব্র বেদনা কাজ করছে। তাদের কিছুই করার নেই, কোথাও যাওয়ার নেই। এই সময়কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ ক’জন তরুণ-তরুণী আত্মহত্যা করেছে। এতে অনেকে মনে করছেন এরা হতাশা থেকে এই কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলেছে, করোনা মহামারির কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে এই তরুণ প্রজন্ম, কারণ এই তরুণদের ২৫% বেকার।

গত দুই বছরে দুটি বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল বের হওয়ার কথা থাকলেও একটিও বের হয়নি। তাহলে বিসিএস পরীক্ষার্থীরা বয়স ছাড়ের সুবিধা পাবেন না কেন? গত দেড় বছরে যারা স্নাতক সম্মান শিক্ষার্থী ছিলেন, তারাই-বা কী দোষ করেছেন? এ অবস্থায় সরকারের উচিত চাকরির বয়সসীমার বিষয়টি দরদ দিয়ে চিন্তা করা।

চাকরির বয়স দু’বছর বাড়ালে সরকারের কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু অন্যদিকে অনেকগুলো তরুণ-তরুণী চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
সরকার বাজেটে এই খাতে কোনো বরাদ্দ রাখেনি, এদের নিয়ে নেই কোনো পরিকল্পনা, প্রণোদনা ভাতা বলেও কিছু নেই। সেক্ষেত্রে শুধু শুধু চাকরির বয়সটা আটকে রাখার কোনো মানে হয় না। এতগুলো তরুণ-তরুণীর জীবন থেকে সময়, টাকা, আশা, ভালবাসা, স্বপ্ন সব ভেসে গেছে বা যাচ্ছে। তাই আমরা আশা করবো, সরকার চাকরি প্রত্যাশী তরুণদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে ভাববেন। ভাববেন করোনাকালে বেকার ও পথে বসে যাওয়া ব্যবসায়ীদের কথাও।

শাহানা হুদা রঞ্জনা ।। সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন