ভিনদেশি পাখির সমাগমে মুখর ‘চাতল বিল’

স্বাধীন নিউজ ডেস্ক।
ছবি: টি আর তানভীর রহমান
মামুনূর রহমান হৃদয়

শীত প্রধান দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে শুরু করেছে অতিথি পাখি। সাইপ্রাসের মতো দেশে শীত তীব্র হয়ে উঠলে সে দেশের পাখিরা এ দেশের আতিথেয়তা গ্রহণ করতে হাজার মাইল পথ পাড়ি দেয়। তখন ভিনদেশি বিচিত্র সব বর্ণ ও প্রজাতির অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে আমাদের দেশের খাল-বিল।

ঋতু বৈচিত্র্যে আমাদের দেশের প্রকৃতিতেও লেগেছে শীতের ছোঁয়া। হাঁড় কাঁপানো শীতের তীব্রতায় কুয়াশার চাদরে জড়ানো সকাল, হিম শীতল বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসা কিচিরমিচির আওয়াজ যেন ছোট এক জলাশয়ের গল্প বলে। ‘চাতল বিল’ নাম তার। শীতকালে যে জলাশয়ে উচ্ছ্বাস তোলে অতিথি পাখির দল। হাজারো মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসব পাখি আসে শুধু একটু উষ্ণতার জন্য।

নরসিংদীর মনোহরদীর পাশ ঘিরেই চাতল বিল। যেখানে দেখা মেলে চাতল বিলের অতিথি পাখিদের। শীতের এ সময়টাতে যেন অন্য এক রূপ ধারণ করে। মুগ্ধতার এক রূপ। প্রতিটা মুহূর্তই যেন নতুন। অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে বিল। তখন মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে ‘চাতল বিল’। অতিথি পাখি দেখতে চাতল বিলে এরই মধ্যে উৎসুক মানুষের আগমন শুরু হয়েছে পৌষের শুরুতেই।

এসব অতিথি পাখির আগমন ঘটে উত্তর মেরু থেকে। ইংল্যান্ডের নর্থ হ্যামশায়ার, সাইবেরিয়া কিংবা অ্যান্টার্কটিকার তীব্র শীত যখন মাইনাসে চলে যায়; তখন সেখানে দেখা দেয় প্রচণ্ড খাদ্যাভাব। তীব্র শীতে পাখির দেহ থেকে খসে যায় পালক। জীবনধারণের জন্য অনুকূল পরিবেশ না থাকায় পাখিগুলো অপেক্ষাকৃত কম শীত ও অনুকূল প্রকৃতির দেশে অতিথি হয়ে আসে। নাতিশীতোষ্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতি বছর সাদরে গ্রহণ করে অতিথি পাখিকে। এ দেশ হয়ে ওঠে অতিথি পাখির খাদ্য ও জীবনধারণের নিরাপদ আবাসস্থল।

প্রকৃতিগতভাবেই এ পাখিদের শারীরিক গঠন খুব মজবুত। এরা সাধারণত ৬০০ থেকে ১৩০০ মিটার উঁচু দিয়ে উড়তে পারে। ছোট পাখির গতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার। দিনে-রাতে এরা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উড়তে পারে। বড় পাখি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার অনায়াসে ওড়ে। আশ্চর্যের বিষয়, এসব পাখি তাদের গন্তব্যস্থান কখনো ভুল করে না।

আমাদের দেশে ৭৪৪ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে ৩০১টি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে বলে এদের ‘আবাসিক’ পাখি বলে। খণ্ডকালীন নিয়মিতভাবে আসে ২৪৪ প্রজাতির বেশি পাখি, যা বাংলাদেশের অতিথি পাখি হিসেবে বিবেচিত। এ দেশে অতিথি পাখির আগমন ঘটে সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসে। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এ দু মাসে বেশি পাখি আসে। বাংলাদেশের নানা প্রান্তে দেখা মেলে অতিথি পাখির। এসব অতিথি পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকে পুরো প্রকৃতি। এক মোহনীয় রূপ ধারণ করে বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলগুলোয়।

শীতের প্রচণ্ড প্রকোপ থেকে বাঁচতে আমাদের দেশে অতিথি হয়ে আসে যেসব পাখি: সোনাজঙ্গ, খুরুলে, কুনচুষী, বাতারণ, শাবাজ, জলপিপি, ল্যাঞ্জা, হরিয়াল, দুর্গা, টুনটুনি, রাজশকুন, লালবন মোরগ, তিলে ময়না, রামঘুঘু, জঙ্গি বটের, ধূসর বটের, হলদে খঞ্চনা, কুলাউ, চিনাহাঁস, রাজহাঁস, গিরিয়া হাঁস, বৈকাল হাঁস, বালিহাঁস, চিতি হাঁস, ভূতি হাঁস, গাংকবুতর ইত্যাদি।

বাতাসে শীতের আমেজ লাগতেই আমাদের হাওর, বিল ও চরাঞ্চলে দেখা যায় হাজার হাজার অতিথি পাখি। ১৯৮০ সাল থেকে মিরপুর চিড়িয়াখানার হ্রদে অতিথি পাখির দেখা মিলছে। অতিথি পাখির দেখা মিলছে বাংলাদেশের নীলফামারীর নীলসাগর, নিঝুম দ্বীপ, হাকালুকি হাওর, বরিশালের দুর্গাসাগর, সিরাজগঞ্জের হুরা, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাটল হাওর ও সোনাদিয়ায়। এ ছাড়া অতিথি পাখিদের অভয়ারণ্য হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।

শীতের প্রকোপ কমলে অতিথি পাখিরা আবার ছুটে যায় নিজ জন্মভূমিতে। অবকাশ যাপনের ইতি ঘটিয়ে আপন ভূমিতে যাওয়ার জন্য আবারও হাজার মাইল পাড়ি দেয় তারা। তবে যে নিরাপত্তার জন্য এ দেশে তারা আসে, দুঃখের বিষয় কিছু অসাধু মানুষ লোভের বশে তাদের শিকার করে। শিকারিরা ফাঁদ ও জাল তৈরি করে প্রস্তুত থাকেন শীতের আগে থেকে। বিভিন্ন উপায়ে তারা শিকার করেন অতিথি পাখি। বিভিন্ন চরাঞ্চলে ধানের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে এবং কারেন্ট জাল দিয়ে শিকার করা হয় এসব পাখি।

শিকারির ফাঁদে পড়ে প্রতি বছর এসব অতিথি পাখির সংখ্যা কমছে। এভাবে প্রতি বছর অতিথি পাখি নিধন হতে থাকলে প্রকৃতি হারাবে তার নিজস্ব রূপ, বিলুপ্ত হবে বহু পাখির প্রজাতি। তাই সবার উচিত, অতিথি পাখিদের নিরাপত্তা দানে মানবিক হওয়া। সর্বোপরি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ‘অতিথিদের আতিথেয়তা’ দেওয়া জরুরি।

লেখক: শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী।

এই ওয়েবসাইটের সকল লেখার দায়ভার লেখকের নিজের, স্বাধীন নিউজ কতৃপক্ষ প্রকাশিত লেখার দায়ভার বহন করে না।
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -