মন গলেনি কারও, দুই শিশুর ঠাঁই হলো সাংবাদিকের বাসায়

0
17

জেলা প্রতিনিধি, বরগুনা

শিশু আলিফ ও গালিব

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দাদির দায়ের করা মামলায় মা কারাগারে। একই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে পলাতক বাবা। তাই দুই বছর বয়সী দুগ্ধপোষ্য ভাইকে নিয়ে মায়ের মুক্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে বরগুনার টাউন হল এলাকায় অবস্থান নেয় ১৩ বছর বয়সী শিশু আলিফ।

শনিবার (১৭ জুলাই) সকালে টাউন হল এলাকার অগ্নিঝরা একাত্তরের পাদদেশে অসহায় দুই শিশুর এ অবস্থান দেখে অবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকেই।

সকাল গড়িয়ে দুপুর, এরপর বিকেল হলেও অসহায় এই দুই শিশুর পাশে দাঁড়ায়নি কেউ। দুপুরের পর কে বা কারা অসহায় এই দুই শিশুকে নিয়ে যান বরগুনার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে। এরপর সারাদিনের তপ্ত রোদে অভুক্ত এই দুই সহোদরের স্থান হয় জেলা প্রশাসকের সামনের বটগাছের নিচে। এরপর সন্ধ্যা নেমে এলেও এগিয়ে আসেননি কেউ। ততক্ষণে ক্লান্ত আর অভুক্ত দুগ্ধপোষ্য শিশু গালিফ বড় ভাই আলিফের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে বটগাছের নিচে।

মানবেতর পুরো একটি দিন যাপনের পরও কেউ এগিয়ে আসেনি অসহায় এই দুই শিশুর পাশে। অবশেষে সন্ধ্যায় এই দুই শিশুকে নিজ বাসায় নিয়ে যান স্থানীয় সাংবাদিক অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ।

সোহেল হাফিজ বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠের বরগুনা প্রতিনিধি ও এনটিভির স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে ওই দুই শিশু তার বাসায়ই অবস্থান করছে।

দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই আলিফ অত্যন্ত মেধাবী। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে আলিফও গাজীপুরে বসবাস করে। আলিফ সেখানকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে একটি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে মেধাবী শিক্ষার্থী আলিফ ইংল্যান্ডে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছে। ওর ভিসাও প্রস্তুত। করোনার কারণে তার ইংল্যান্ড যাওয়া বিলম্বিত হচ্ছে।
দাদি আলেয়া বেগমের দায়ের করা মামলায় মা আনিতা জামান ও বাবা মনিরুজ্জামান জুয়েলের পাশাপাশি ১২ বছর ১১ বয়সী আলিফকে ১৮ বছর বয়সী উল্লেখ করে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত ২২ জুন মামলার বাদী আলেয়া বেগমকে মারধরের অভিযোগে বরগুনা সদর থানায় ২৮ জুন মামলা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে আলিফ বলে, মামলায় ঘটনার তারিখ যেদিন উল্লেখ করা হয়েছে সেদিন আমার বাবা গাজীপুরে তার কর্মস্থলে ছিলেন। সেখানে ডিজিটাল হাজিরায় তার উপস্থিতি রয়েছে। অন্যদিকে আমার দাদা বাড়িতে অবস্থানকালে আমার সামনেই জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আম্মুকে মারধর করেছে আমার ফুফুরা। এরপর উল্টো আমার দাদিকে মারধরের অভিযোগে আমিসহ আমার মা-বাবাকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় গত বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) আমার আম্মুকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আমার নানু বাড়ি গোপালগঞ্জে। দাদু বাড়ির আত্মীয়-স্বজন ছাড়া বরগুনায় আমাদের আর কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মা-বাবার অনুপস্থিতিতে একমাত্র দুগ্ধপোষ্য ভাইকে নিয়ে আমি রাস্তায় মানবেতর জীবনযাপন করছি।

বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হাসানুর রহমান ঝন্টু জানান, পারিবারিক সহিংসায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। ক্ষতিগ্রস্তও হয় শিশুরা। বরগুনার অসহায় দুই শিশু আলিফ এবং গালিব তার প্রমাণ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ দুই শিশুর কেউ দায়িত্ব না নেওয়ায় মানবিক কারণে বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সোহেল হাফিজ ও তার স্ত্রী জাফরিন নিতু সন্ধ্যার দিকে তাদের বাসায় নিয়ে যান।

তিনি বলেন, দোষ-ত্রুটি যাই থাকুক তার সবই পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের। এ ঘটনায় শিশুরা কেন ভুক্তভোগী হবে। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

এ বিষয়ে উভয়পক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনার কারণে গত তিন মাস ধরে শিশু আালিফ ও গালিফকে নিয়ে মা আনিতা জামান বরগুনায় তাদের গ্রামের বাড়ি আয়লা-পাতাকাটা ইউনিয়নের খেজুরতলা গ্রামে থাকতেন। জমিজমা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পারিবারিকভাবে আলিফ ও গালিফের বাবা মনিরুজ্জামান জুয়েলের মা-বোনদের সঙ্গে কলহ চলছে। এসব কলহের জের ধরে আলেয়া বেগম তার ছেলে মো. মনিরুজ্জামান, পুত্রবধূ আনিতা জামান ও নাতি আলিফের বিরুদ্ধ বরগুনা থানায় মারধরের অভিযোগে মামলা করেন। সে মামলায় গত ১৫ জুলাই আনিতা জামানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, শিশু আলিফ ও গালিফের নানা বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায়। বরগুনায় তার দাদার বাড়ির স্বজন ছাড়া আর কোনো স্বজন নেই।

তিনি বলেন, এক পক্ষে আলিফ-গালিফের দাদি ও ফফুরা অন্যদিকে বাবা-মা। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের কারণে পারিবারিকভাবে এ দুই পক্ষের বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। দাদি আলেয়া বেগমের দায়ের করা মামলায় আলিফ ও গালিবের মা অনিতা জামান কারাগারে রয়েছেন। যে শিশুটির বয়স ১৩ বছর তাকে মামলায় ১৮ বছর দেখানো হয়েছে। এখানে আদালতের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম সিকদার জানান, ভুক্তভোগী দুই শিশু আলিফ ও গালিফের ফুফুদের পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের ধরে এ মামলা করা হয়েছে। এতে অসহায়ত্বের শিকার হয়েছে ছোট দুই শিশু। দুগ্ধপোষ্য শিশু ও এবং করোনাকালে একজন নারীর অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে আদালতে জামিনের আবেদন করেছিলাম। আদালত জামিন নামঞ্জুর করেছেন। আগামীকাল রোববার আবারও আসামিপক্ষে জামিন আবেদন করা হবে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মিসকাত সাজ্জাদ জানান, করোনাকালে গত তিনমাস ধরে শিশু আালিফ ও গালিফের বাবা-মা বরগুনায় থাকছেন। জমিজমা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পারিবারিকভাবে আলিফ ও গালিফের বাবা মনিরুজ্জামান জুয়েলের সঙ্গে মা-বোনদের কলহ চলছে। আলিফের বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে বৃদ্ধ আলেয়া বেগমকে মারধরের অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে সাংবাদিক সোহেল হাফিজ বলেন, দুগ্ধপোষ্য ছোট ভাই গালিফকে সঙ্গে নিয়ে বড় ভাই আলিফের সারাদিন রাস্তায় কেটেছে। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও ওদের কোনো স্বজন কিংবা কেউ এগিয়ে না আসায় অত্যন্ত মানবিক কারণে আমি ওদের আমার বাসায় নিয়ে এসেছি। ওরা দুই ভাই আমার বাসায় আমার দুই সন্তানের সঙ্গেই আছে। যতদিন পর্যন্ত ওদের মা জামিন না পায় ততদিন পর্যন্ত ওরা আমার বাসায় আমার সন্তানের মতোই থাকবে।
এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, সন্ধ্যার দিকে অসহায় শিশু অলিফ ও গালিফের অসহায়ত্বের কথা ভেবে মানবিক কারণে বরগুনা প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি সোহেল হাফিজ ও তার স্ত্রী জাফরিন নিতু আপাতত তাদের দায়িত্ব নিয়েছেন। আমরা আলিফ ও গালিফের জন্য বরগুনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব রকমের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবো।