মরহুম আব্দুল মমিন এঁর ১৭তম প্রয়াণ দিবসে বিভিন্ন মহলের শ্রদ্ধাঞ্জলি

0
12

আব্দুর রহমান ঈশান
বিশেষ প্রতিনিধি,
স্বাধীন নিউজ

বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ(মোহনগঞ্জ, নেত্রকোণা),মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সমাজসেবী, প্রাক্তন খাদ্য, ত্রাণ-পুনর্বাসন ও কৃষি মন্ত্রী, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ), বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর মোট চার বার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও আওয়ামীলীগ এর প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত আব্দুল মমিন আজকের এইদিনে মৃত্যুবরণ করেন।
জাতীয় নেতা আব্দুল মমিন এঁর ১৭তম প্রয়াণ দিবসে বিভিন্ন গুনীজন ও রাজনৈতিক মহল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছেন।

জন্ম ও পরিবার :
তিনি মোহনগঞ্জ উপজেলার কাজিয়াটি গ্রামে ১৯২৯ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি মোহনগঞ্জের বিশিষ্ট সমাজসেবী মরহুম খান সাহেব আব্দুল আজিজ আহমেদ (১৮৯৬-১৯৭৮) এর পুত্র। মরহুম খান সাহেব আব্দুল আজিজ আহমেদ মোহনগঞ্জ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে যথেষ্ট ভুমিকা পালন করেন। ব্রিটিশ সরকারের সময়ে প্রথমে ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট এবং পরে নেত্রকোণা সাব-ডিভিশন এর অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হয়ে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান উভয় শাসনামলের অনেকটা সময় ধরে উক্ত দুই পদে নিয়োজিত ছিলেন তিনি।তিনি ১৯৩১ সালে নিজবাড়ীর জায়গা মোহনগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য দান করে নিজে অন্যত্র বাড়ী নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন।স্থাপন করেন মোহনগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৬৯ সালে তিনি ৫ একর জমিদান করে সে জমির উপর মোহনগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। মোহনগঞ্জ সদরের বড় মসজিদ ও খারিজী মাদ্রাসারও তিনি প্রতিষ্ঠাতা । এছাড়া ও তিনি আরো অনেক জনহিতকর কাজ করে গেছেন। ব্রিটিশ সরকার আব্দুল আজিজ আহমেদকে “খান সাহেব” উপাধিতে ভূষিত করেছিল ।
মরহুম আব্দুল মমিন সাহেবেরা দুই ভাই ও তিন বোন। প্রফেসর ড. আব্দুল মতিন তাঁরই সুযোগ্য ভাই । ডঃ আব্দুল মতিন সৌদি আরবের কিং ফয়সাল আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আনবিক শক্তি কমিশন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।
তাঁর স্ত্রী রেবেকা মমিন নেত্রকোনা-৪ আসন (মোহনগঞ্জ, মদন খালিয়াজুরী) এর বর্তমান নির্বাচিত এমপি। জয়া তাঁদের একমাত্র কন্যা সন্তান।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান:
১৯৭০ সালের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আব্দুল মমিন মোহনগঞ্জ আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। উল্লেখ্য যে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নেত্রকোণার তিনটি জাতীয় পরিষদের আসনে আব্দুল মমিন, জোবেদ আলী, সাদির উদ্দিন আহমেদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সকল আসনে আঃ খালেক, হাদিস উদ্দিন চৌধুরী, ডাঃ আখলাকুল হোসেন, আব্বাস আলী খান, আব্দুল মজিদ তারা মিয়া, নজমুল হুদা বিপুল ভোটে ৬ দফা ও ১১ দফার সমর্থনে জয়লাভ করেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে দেশের রাজনৈতিক উত্তাল পরিবেশ -পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ও ছাত্র যুব নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতির জন্য নেত্রকোণার গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েন। সেই লক্ষ্যে সর্বজনাব শামসুজ্জুহা, সাফায়েত আহমদ খান, গোলাম এরশাদুল রহমান, হায়দার জাহান চৌধুরী , গোলজার হোসেন, আশরাফ আলী খান খসরু, আমিরুল ইসলাম, গাজী দেলোয়ার হোসেন, আঃ রহিম, জহিরুল হক হীরা, নির্মল কুমার দাশ, নজরুল ইসলাম খান ও জসিম উদ্দিন, ১৯৭০ এর বিজয়ী সংসদ সদস্যদের নিয়ে ফজলুর রহমান খান, জামাল উদ্দিন আহমেদ, শহিদ উদ্দিন আহমদ, আব্দুল মন্নান, এনআই খান সহ জেলার সর্বত্র শতাধিক জনসভায় স্বাধীনতার চেতনাকে শাণিত করার লক্ষ্যে বক্তব্য দেন।

তাঁর রাজনীতি:
আব্দুল মমিন ভাটি বাংলার গর্ব, বাংলাদেশের কৃতী সন্তান। তিনি বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন এবং তিনি ছিলেন মরহুম তাজউদ্দীন আহমদের বন্ধু। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সুদীর্ঘ সময়জুড়ে রাজনীতি করেছেন এবং সেই সময়কার রাজনীতির প্রগতিশীল ধারাটির সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
মরহুম আব্দুল মমিন রাজনীতি করেছেন পুরোটাই হাওড়কেন্দ্রিক জনপদকে ঘিরে। তার নির্বাচনী এলাকা খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ ও মদনের প্রায় পুরোটাই হাওড়। মমিন সাহেবের বাড়ির উঠোনে বসে চোখে পড়ে বিখ্যাত ডিঙ্গাপোতার হাওড়। উঠোনে পায়চারি করলেই তার গায়ে লাগত হাওড়ের বাতাস। সেজন্য হাওড়ের পাড়ে হলেও তাকে রাজনীতির পুরো সময়টা একেবারে হাওড় অঞ্চল নিয়েই কাটাতে হয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি তার থানার সঙ্গে বারহাট্টা পেয়েছিলেন বলে হাওড়ের বাইরের জনপদে রাজনীতি করতে পেরেছিলেন। আরও একবার দুটি আসনে নির্বাচন করার সময় তিনি নেত্রকোণা-বারহাট্টা অঞ্চলের প্রতিনিধি ছিলেন। তবে বাস্তবতা হলো, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিলেও হাওড়ের মানুষের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ভরসাস্থল ছিলেন তিনি।
তিনি অপেক্ষাকৃত মুখচোরা মানুষ ছিলেন। সচরাচর নিজের ঢোল নিজে পেটানো পছন্দ করতেন না। কেউ তাঁর ঢোল পেটাক সেটাও চাইতেন না। কেউ তাঁকে অকারণে তোষামোদ করে পার পেত না। তাঁর রাজনীতি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। মানুষকে তিনি তাঁর কর্মের বিচার দিয়ে চিনতেন। খুব সহজেই বুঝে ফেলতেন কার কি উদ্দেশ্য। নীতির প্রশ্নে কোনদিন আপোস করতেন না। কখনও রাজনীতিকে নিজের, দলের বা কর্মীদের লোভ লালসার বিষয় হতে দেননি। কোন অন্যায়ের পক্ষে তিনি দাঁড়াতেন না। ন্যায়ের পক্ষে যত অপ্রিয় বিষয়ই হোক তিনি সেটি বলতেন। দেশের রাজনীতি ছাড়াও সকল বিষয়েই তিনি পন্ডিত ছিলেন। এমন কোন বিষয় নেই যেটি সম্পর্কে তিনি ন্যূনতম জ্ঞান রাখতেন না।

তিনি সারা জীবনে একটি কাজের জন্য অনুশোচনা করেছেন। সেটি হলো, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি মুশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়াটাকে নিজের বিবেচনায় সঠিক কাজ মনে করেননি।
তিনি ৭৫ বছর বয়সে ১৫ জুলাই ২০০৪ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল হাসপাতালে মৃত্যু বরণ করেন।তাঁকে মোহনগঞ্জ তাঁদের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।