মহামারি ও রোগ প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা

0
248

‘একটি সুন্দর এবং সুস্থ বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে’ স্লোগানে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। ১৯৪৮ সাল থেকে প্রতি বছর ৭ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। আর এ দিনেই প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়াল্ড হেলথ অরগানাইজেশন তথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো- ‘বিল্ডিং এ ফেয়ারার, হেলদিয়ার ওয়ার্ল্ড’ (Building a fairer, healthier world for everyone) অর্থাৎ একটি সুন্দর এবং সুস্থ বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। প্রাণঘাতী বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবের এ সময়ে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই কেবল মহামারি ও রোগ-ব্যধিমুক্ত সুন্দর ও সুস্থ বিশ্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।

আজকের যে দিনটিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হচ্ছে, ঠিক তার আগের দিন তথা ৬ এপ্রিল করোনায় এ যাবত কালের সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৬৬ জনের মৃত্যু হয়। এখন পর্যন্ত একদিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু। এ নিয়ে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৯ হাজার ৩৮৪ জন।

গত বছরের ৩০ জুন করোনায় সর্বোচ্চ ৬৪ জনের মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার (৬ এপ্রিল) একদিনে মৃত্যুর সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। মহামারি করোনাসহ যে কোনো অসুখ-ব্যধিতে ইসলামের দিকনির্দেশনা মানায় রয়েছে সুস্থ থাকার অনন্য উপায়।

সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতায় করণীয়
ইসলামে সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতার মর্যাদা রক্ষয় বেশ কিছু করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছে ইসলাম। হাদিসে পাকে প্রিয় নবি সাল্লাল।লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিকনির্দেশনামূলক কথাগুলো নসিহত হিসেবে তুলে ধরেছেন।

> সুস্থতাকে মর্যাদা দেয়া
সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতা মহান আল্লাহর নেয়ামত। এর জন্য সবচেয়ে বেশি তাগিদ ও গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম। অসুস্থ হয়ে যাওয়ার আগে সুস্থতার মর্যাদা দেয়ার কথা বলেছেন বিশ্বনবি। হাদিসে এসেছে-
হজরত মাইমুন বিন মাহরান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‌পাঁচটি অবস্থাকে পাঁচটি বিষয়ের আগে গণীমত মনে কর। তাহলো-
১. বার্ধক্যের আগে যৌবনকালকে।
২. অসুস্থ্যতার আগে সুস্থতাকে।
৩. ব্যস্ততার আগে অবসর সময়কে।
৪. দারিদ্র্যের আগে স্বচ্ছলতাকে।
৫. মৃত্যুর আগে জীবনকে (হায়াত)। (তিরমিজি, মুসলিম, মুস্তাদরেকে হাকেম, বয়হাকি)

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও আজ এ স্লোগান দিচ্ছে- Prevention is better than cure অর্থাৎ অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে মর্যাদা দেওয়া তথা রোগ প্রতিকার করা বা চিকিৎসা গ্রহণ করার চেয়ে প্রতিরোধ বা সচেতনতা অবলম্বন করা উত্তম।

> মহামারির উৎপত্তির কারণ রোধ করা
রোগ-ব্যাধি ও মহামারির উৎপত্তির পথ রোধ করার কথা বলেছেন স্বয়ং বিশ্বনবি। যেসব অভ্যাস ও কাজে দূরারোগ্য ব্যাধি ও মহামারি আক্রমণ করে তা ঠেকাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
‘হে মুহাজির সম্প্রদায়! এমন পাঁচটি অভ্যাস রয়েছে, সেগুলো যেন তোমাদের মধ্যে পাওয়া না যায়। যেগুলোর জন্য আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘অশ্লীলতা’। যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা প্রকাশ পায়, তখন তাদের মাঝে প্লেগসহ ও বিভিন্ন ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি মহামারি আকারে প্রকাশ পায়। যা তাদের পূর্বপুরুষরাও কখনো শোনেনি।

> পাপাচার ছেড়ে দেয়া
সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য পাপাচার ও অন্যায় কাজ ছেড়ে দেয়ার বিকল্প নেই। পাপাচারের কারণে রোগ ও মহামারিতে আক্রান্ত হয় মানুষ। আল্লাহ বলেন-
– ‘জলে ও স্থলে মানুষের কৃতকর্মের কারণে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (অন্যায়-অনাচার-জুলুম থেকে) ফিরে আসে। (সুরা রুম : আয়াত ৪১)
– রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে তোমরা সুস্বাস্থ্য প্রার্থনা কর, কারণ ইমানের পর সুস্বাস্থ্যের চেয়ে অধিক মঙ্গলজনক কোনো কিছু কাউকে দান করা হয়নি।’ (ইবনে মাজাহ)

> সুস্থতার প্রয়োজনীয়তা
সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতা শুধু মানব জীবনের জন্যই জরুরি বিষয় নয় বরং ইসলামের বিধি-বিধানগুলো সুন্দরভাবে পালন করার জন্যও সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতার প্রয়োজন অনেক বেশি। কারণ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ছাড়া ইবাদতেও মন বসে না। হাদিসে এসেছে-
‘দুর্বল মুমিনের তুলনায় শক্তিশালী মুমিন অধিক কল্যাণকর ও আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (মুসলিম)

– প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মর্মে সতর্ক করেছেন যে, ‘অধিকাংশ মানুষেই দুটি নেয়ামাতের বিষয়ে অসতর্ক থাকে এবং প্রতারিত হয়। তাহলো-
১. সুস্থতা এবং
২. অবসর। (বুখারি)

– প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন-
‘কেয়ামতের দিন বান্দাকে সর্বপ্রথম নেয়ামত সম্পর্কে যে প্রশ্নটি করা হবে তাহলো- তার সুস্থতা সম্পর্কে। তার কাছে জানতে চাওয়া হবে- আমি কি তোমাকে শারীরিক সুস্থতা দান করিনি? (তিরমিজি)

> রোগ-ব্যধি ও মহামারি প্রতিকারের তাগিদ
কোনো রোগ-ব্যাধি বা মহামারিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা গ্রহণ করা খুবই জরুরি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করতেন। আবার লোকদের চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করতেন। একাধিক হাদিসের বর্ণনায় এসেছে-
– রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর, কেননা মহান আল্লাহ তাআলা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি। তবে একটি রোগ আছে যার কোনো প্রতিষেধক নেই, তাহলো বার্ধক্য।’ (আবু দাউদ)

– হজরত সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি একবার ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দেখতে এসে তার হাত মোবারক আমার বুকের ওপর রাখেন। আমি অন্তরে এর শীতলতা অনুভব করি। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছ। তুমি ছাকীফ গোত্রের হারেস ইবনে কালদার কাছে যাও। সে (এই রোগের) চিকিৎসা করে।’ (আবু দাউদ)

– বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা রোগ দিয়েছেন, রোগের প্রতিষেধকও নাজিল করেছেন। প্রত্যেক রোগের চিকিৎসা রয়েছে। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। তবে হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণ করবে না।’

-তিনি আরও বলেন, ‘হারাম বস্তুতে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য আরোগ্য বা রোগমুক্তি রাখেননি।’

সুতরাং হাদিসে দিকনির্দেশনায় প্রমাণিত যে, ইসলামের দৃষ্টিতে সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতার দিকে নজর দেয়া যেমন জরুরি। তেমনি রোগ-ব্যাধি বা মহামারিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা গ্রহণ করা শুধু বৈধই নয় বরং তা গ্রহণ করা আরও বেশি জরুরি।

পরিশেষে
মহামারি করোনাসহ রোগ-ব্যাধিমুক্ত ‘একটি সুন্দর এবং সুস্থ বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে’। মহামারির ক্ষেত্রে করণীয় ও দিকনির্দেশনাগুলো যথাযথ মেনে চলতে হবে। হাদিসের ওপর আমল করতে হবে। তবেই সম্ভব মহামারি ও রোগ-ব্যাধিমুক্ত একটি সুন্দর এবং সুস্থ বিশ্ব গড়া সম্ভব।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের দিকনির্দেশনা মেনে চলার এবং সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। দুনিয়ার যাবতীয় মহামারি ও রোগ-ব্যাধি থেকে সুস্থ থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।