1. hridoy@pipilikabd.com : হৃদয় কৃষ্ণ দাস : Hridoy Krisna Das
  2. support@pipilikabd.com : pipilikabd :
  3. md.khairuzzamantaifur@gmail.com : তাইফুর রহমান : Taifur Bhuiyan
  4. admin@swadhinnews.com : নিউজ রুম :
রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ০১:৪১ অপরাহ্ন

মা (ছোটগল্প) | জিল্লুর রহমান

হৃদয় কৃষ্ণ দাস
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২০
  • ১৯৩ বার পঠিত
মা (ছোটগল্প) | জিল্লুর রহমান

জাহানারা বেগম গোঁ-ধরে বসে আছেন। লাশের সাথে তিনি যাবেনই। পুলিশের লোকেরা প্রথমে অনেক করে বুঝিয়েছে। পরে বেশ ধমকও দিয়েছে। কিন্তু কোন কিছুতেই কাজ হয়নি।

পুলিশ সদস্যরা বুঝতে পারছে না, তাদের কি করা উচিৎ। কারো মাথায় আসছে না, হাসপাতালের একজন আয়া কেন বেওয়ারিশ একটা লাশ দাফনে সাথে যাবার জন্য এভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

থানায় জানানো হয়েছিল, একটা লোক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গতরাতে মারা গেছে। লাশ সারারাত মর্গে পড়েছিল। আত্নীয়-স্বজন কেউ আসেনি। বাধ্য হয়ে পুলিশকেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে।

উত্তরা থানার সাব-ইন্সপেক্টর শিপুলের নেতৃত্বে পিপিই পরা তিনজন কনস্টেবল দুপুরের আগেই কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালের মর্গে পৌঁছেছে। কিন্তু ঝামেলা বাঁধিয়েছে ওখানকার ষাটোর্ধ্ব এক আয়া।

তার চাওয়া একটাই। সে লাশের সাথে কবরস্থানে যাবে। বলা নেই কওয়া নেই পুলিশ-ভ্যানের পেছনে উঠে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। কিছুতেই নামছে না। কারো সাথে কথাও বলছে না। উদাস চোখে ভ্যানের পিছনের খোলা অংশ দিয়ে তাকিয়ে আছে চৈত্রের খা খা রোদের দিকে। পলকহীন পাথর চোখের সে ভাষা কারো বোঝার সাধ্য নেই।

শিপুল শেষবারের মতো চেষ্টা চালায়। সে বুঝে গেছে, ধমক-ধামকে কাজ হবে না। আবার বেশি দেরিও করা চলে না। হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জেনেছে, মাস দু’য়েক হলো এখানে কাজ করছে জাহানারা বেগম। সারাদিন আপন মনে রোগীর সেবা করে। কারো সাথে তেমন কথাবার্তা বলে না।

– মা, তোমার বাড়ি কোথায়?
– কুষ্টিয়া।
– তুমি এই লাশ চেন?
– না।
– তাহলে সাথে যেতে চাও কেন? এ প্রশ্নের কোন জবাব আসে না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সাব-ইন্সপেক্টর আবার বলে, করোনায় মারা যাওয়া লাশের সাথে বাইরের কারো যাবার নিয়ম নেই।
– আমার তো এইটা পরা আছে – গায়ের পিপিই দেখিয়ে ঝটপট জবাব দেয় বৃদ্ধা।
– সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু তোমাকে তো কবরস্থানে ঢুকতে দেবে না।
– বাইরে থাকবো।
– দেখো, বেশি ঝামেলা করোনা। ভাল চাও তো নেমে যাও। অনেক দেরি হয়ে গেছে এমনিতেই। যদি কিছু বলার থাকে, আমাকে বলে চলে যাও।
– আমি যাবোই। জাহানারার ছোট্ট কিন্তু বলিষ্ঠ জবাব।

নিরুপায় হয়ে শিপুল ড্রাইভারের পাশের সিটে উঠে বসলো। গাড়ি চলতে লাগলো। তার মনটাও হঠাৎ আজ খারাপ হয়ে গেছে। বৃদ্ধ মহিলার উপদ্রবে বিরক্ত হয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে মৃতের গ্রামের নাম-ঠিকানা জানতে পেরেছে। তারপর থেকেই বুকের মধ্যে হু হু করছে শিপুলের।

লোকটা ময়মনসিংহ মেডিকেল থেকে রেফার্ড হয়ে একটি এনজিও’র সহায়তায় ঢাকার কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি হয়। করোনার উপসর্গ নিয়ে সে ত্রিশাল উপজেলার দরিরামপুর গ্রাম থেকে গত সপ্তাহে ময়মনসিংহ এসেছিল । নাম হুমায়ূন ব্যাপারী।

দরিরামপুর শব্দটাই শিপুলকে নস্টালজিক করে তুলেছে। এই গ্রামেই যে তার জন্ম। জন্মের মাত্র চার বছরের মাথায় গ্রাম্য ধাত্রীর হাতে দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেবার সময় তার মা মারা যায়। অনেকটা বিনা চিকিৎসায়। বাচ্চাটা নাকি ক’দিন ধরেই পেটের মধ্যে মরে ছিল। মায়ের অকাল মৃত্যুর পর সংসার দেখাশোনা করা, বিশেষকরে রান্নাবান্না করার মতো কেউ ছিল না। মনে পড়ে, সেই ছোট্ট বয়সে স্কুলের দপ্তরি বাবাকে এটা-সেটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করতো সে।

মাস ছয়েক পরে বাবা আর একটা বিয়ে করেন। নতুন মার সংসারে ভাল ছিল না শিপুল। নানা অত্যাচার আর অবহেলার মধ্যে দুর্বিসহ সময় কাটছিল। কিছুদিন পর বড়মামা এসে তাকে দরিরামপুর থেকে নিয়ে যায়। সেই থেকে নোয়াখালির নিঝুমদ্বীপ স্থায়ী ঠিকানা হয় শিশু শিপুলের।

সেখানেই স্কুল এবং কলেজ শেষ করে সে। ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবে। মায়ের চিকিৎসা ঠিক মতো হয় নাই। ডাক্তার হয়ে জন্মভূমি দরিরামপুর গ্রামে ফিরে যাবে। দরিদ্র অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেবে। আর মায়ের কবরটা খুঁজে বের করে বাঁধাই করবে।

মা মারা যাবার বছর দেড়েক পর সেই যে এসেছে আর কখনো দরিরামপুর যাওয়া হয় নাই শিপুলের। শুনেছে, বাবাও বেশি দিন বাঁচেন নাই। মায়ের চেহারাটা আজ আর ভাল মনে পড়ে না। কেবল পথ চলতে কখনো সখনো অসহায়, অসুস্থ কোন বৃদ্ধাকে দেখলে চোখের কোনা ঝাপসা হয়ে আসে। ছায়ার মতো অস্পষ্ট একখানা মুখ তার মনের চোখে ভেসে ওঠে।

গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হবার মৃদু ঝাঁকুনিতে সম্বিত ফিরে পায় শিপুল। ড্রাইভার অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। শার্টের বাম হাতায় গোপনে চোখ মুছে নেয়। তাড়াতাড়ি নেমে গাড়ির পিছনে চলে যায়। চারজন ধরাধরি করে লাশ নামায়। দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে এগিয়ে যায় কবরের দিকে। চুপচাপ তাদের পেছন পেছন আসতে থাকে বয়স্ক মহিলাটি। গেট পর্যন্ত এসে থেমে যায়।

লাশ কবরে নামিয়ে কেবলমাত্র মাটি হাতে তুলে নিয়েছে শিপুল। এমন সময় বিকট একটা চিৎকার শুনে ফিরে তাকায়। দেখে, গেটের কাছে মহিলাটি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছে। ছুটে গিয়ে গাড়ি থেকে পানি এনে চোখে মুখে ঝাপটা দেয়। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে আসে। বড় বড় দু’তিনটা শ্বাস নিয়ে উঠে বসেন জাহানার। খুটিতে হেলান দিয়ে আপন মনে কি যেন বলতে থাকেন। আস্তে আস্তে কথাগুলো পরিষ্কার হয়ে আসে।

আমার বাড়ি ত্রিশালে। হুমায়ূন আমার ছেলে। ওর বাবা ছিল দরিরামপুর হাই স্কুলের দপ্তরি। বছর দশেক আগে তিনি মারা যান। বাবামরা ছেলেটাকে অনেক আদর সোহাগ দিয়ে মানুষ করেছি। সংসারের দু:খ কষ্ট কোনদিন বুঝতে দেই নাই। কলেজে ভালোই পড়ালেখা করছিল। হঠাৎ একদিন পাশের গ্রামের একটা মেয়েকে বিয়ে করে আনে। – বলে চলেন জাহানারা বেগম।

কিছুদিন পর দেশে মহামারি লাগলো। করোনা ভাইরাসে দেশ-বিদেশে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ মরতে লাগলো। সবাই আতঙ্কে দিশেহারা। এর মধ্যে আমার শুরু হলো গলায় ব্যাথা। সাথে জ্বর আর কাশি। ওষুধ খাই, লাভ হয় না। দিন যায় অসুখ বাড়ে। মাঝে মাঝেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।

একদিন ওরা আমাকে বড় ডাক্তার দেখাতে শহরে নিতে চাইলো। আল্লা আল্লা করে কোন মতে রওনা দিলাম। গাড়ি চলছে তো চলছেই। পথ যেন আর ফুরায় না। ছেলে আর বৌ ফিসফিস করে কী যেন সব বলা-কওয়া করছিল। ভয়ে আমি আধমরা। এক সময় অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

জ্ঞান ফিরে দেখি চারিদিকে অন্ধকার। আমি উপুর হয়ে পড়ে আছি একটা জঙ্গলের ভিতর। পাশে ছেলে-বৌ কেউ নেই। পিপাসায় আমার বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। হিমু, হিমু বলে কতো ডাকলাম। কেউ সাড়া দিল না। এক সময় ডাকার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। বুঝলাম আমি মরে যাচ্ছি। মনে মনে আল্লাকে স্মরণ করলাম। এরপর আর কিছু মনে নেই।

যখন জ্ঞান ফিরলো বুঝলাম, আমি হাসপাতালে। জানলাম, আমাকে অচেতন অবস্থায় রাস্তার পাশের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। গলায় মস্ত এক টিউমার খুঁজে পায়। অপারেশন করা হয়েছে। দিন কয়েক বাদে আমার ব্যান্ডেজ খুলে দিল। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলাম।

করোনায় আক্রান্ত ভেবে আমাকে জঙ্গলে ফেলে যাওয়া হয়েছিল – সে কথা কাউকে বললাম না। বলা যায় না। আমার রক্ত আমাকে ছুড়ে ফেলেছে – এর চেয়ে বড় লজ্জার, যন্ত্রণার কিছু নাই। এ আসলে আমারই ব্যর্থতা; হয়তো আমারই পাপের ফল।

হাসপাতাল থেকে আমাকে ছেড়ে দেয়া হলো। কিন্তু যাব কোথায়? প্রতিজ্ঞা করেছি, ময়মনসিংহ ফিরে যাব না কোনদিন। বাপের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। সেখানেও যাওয়া ঠিক হবে না। আত্নীয়-স্বজন সবাই জানে আমি মরে গেছি। মরে থাকাই ভাল। জীবন দিয়ে যে সত্য জেনেছি তা আমার কাছেই গোপন থাক। তাকে সদরে এনে কাউকে ঝামেলায় ফেলতে চাই না।

ভাইরাসের ভয়ে সবাই তখন তটস্থ। হাসপাতালের আয়ারা ঠিকমতো ডিউটিতে আসছিল না। অথচ রোগীর চাপ দিনকে দিন বাড়ছে। বড় ডাক্তারকে অনুনয়-বিনয় করে বোঝালাম। তার দয়া হলো। আপদকালীন সময়ের জন্য ফুটফরমাস খাটার কাজ পেয়ে গেলাম। শুরু হলো নতুন জীবন।

বৃদ্ধার কথা শুনতে শুনতে কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে বুঝতে পারেনি শিপুল। আলো আঁধারীতে কেউ না দেখলেও সে টের পাচ্ছে, তার বুকের উপরে অনেকটা ভিজে গেছে। গলা শুকিয়ে আসছে।

প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেছে – বলে চলেছেন জাহানারা বেগম। প্রতিদিন অসংখ্য রোগী আসে, যায়। সাধ্য মতো সেবা শুশ্রুষা করি। কাজের মাধ্যমে নিজেকে ছেলে ভুলানো গল্প শোনাই যেন।

গতকাল করোনা ইউনিটে আমার ডিউটি ছিল। একজন রোগীকে দেখে কেমন চেনাচেনা লাগলো। সারা শরীর তার ভাইরাস প্রতিরোধী বিশেষ পোশাকে ঢাকা। নাকে মুখে ভেন্টিলেশনের কলকব্জা লাগানো। একটু কাছে গিয়ে ভাল করে দেখলাম। ঘোলা প্লাস্টিকের মাস্কের আড়ালে সেই নাক, সেই মুখ, সেই চেনা চোখ। প্রায় সঙ্গাহীন দেহটা নিথুয়া পাথারে ডুবে আছে। হায়রে নিয়তি! হায়রে বাছা আমার!

ডাক্তার, নার্স সবাই সাধ্য মতো চেষ্টা করলো। আঁচল পেতে সারাদিন আল্লার দরবারে হুমায়ূনের প্রাণ ভিক্ষা চাইলাম। কতবার জায়নামাজ থেকে উঠে গেছি, খোকা বুঝি ডাকছে আমায়! যদি জ্ঞান ফিরে আমাকে খোঁজে! যদি একবার মা বলে ডাকে!

কিন্তু ডাকলো না। লাজুক চোখ দু’টি মেললো না একবারও। রাতে খোকার ভেন্টিলেটর খুলে দিলো – বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন জাহানার বেগম। বুক চাপড়ে বিলাপ করতে লাগলেন, হে খোদা, কেন তুমি আমাকে না নিয়ে আমার কলিজার টুকরাকে নিয়ে গেলে? কেন?

শিপুল মায়ের হাত ধরলেন। পরম যত্নে গাড়ির ভেতরে নিয়ে বসালেন। ড্রাইভারকে থানা কিংবা হাসপাতালে না গিয়ে গাড়িটা সোজা তার বাসায় নিয়ে যেতে বললেন।

মা (ছোট গল্প)
জিল্লুর রহমান
রাজবাড়ী, ২২ এপ্রিল ২০২০

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..

সাহরি ও ইফতারের সময় সূচি

সাহরি ও ইফতারের সময়সূচী
( রবিবার,৩১ মে ২০২০ )
 বিভাগ
 সাহরি শেষ
 ইফতার
 ঢাকা
 ০৬:০০ মিঃ
 ০৬:০০ মিঃ
 চট্টগ্রাম
 ০৫:৫৮ মিঃ
 ০৫:৫২ মিঃ
 সিলেট
 ০৫:৫১ মিঃ
 ০৫:৫৬ মিঃ
 রাজশাহী
 ০৬:০৫ মিঃ
 ০৬:০৮ মিঃ
 বরিশাল
 ০৬:০২ মিঃ
 ০৫:৫৮ মিঃ
 খুলনা
 ০৬:০৬ মিঃ
 ০৬:০২ মিঃ
 রংপুর
 ০৫:৫৯ মিঃ
 ০৬:০৬ মিঃ
 ময়মনসিংহ
 ০৫:৫৭ মিঃ
 ০৬:০১ মিঃ

ফেসবুকে আমরা

© All rights reserved © 2020 SwadhinNews.com
Design & Developed By : PIPILIKA BD
error: Content is protected !!