রাশিয়া,আমেরিকা ও ইউরোপের সাথে ভারতের বিদেশনীতি যথেষ্ট সফল হলেও কেন গল্ফদেশ গুলো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক!

যুদ্ধ সবসময় অস্ত্রের মাধ্যমেই হয়না, কুটনীতিতে যে দেশ যত বেশী দক্ষ সেই সফল, তার যুদ্ধের প্রয়োজনই পড়েনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুরু হওয়া শীতল যুদ্ধ ১৯৯১ সালে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সংকট লেগেই আছে। কোন দেশ যদি অর্থনৈতিক ও সামরিক ভাবে শক্তিশালী হতে চায় তাহলে তাকে কুটনীতিতে অবশ্যই দক্ষ হতে হবে।

একেই বিশ্বরাজনীতি বা জিওপলিটিক্স বলা হয়, যা স্বার্থ অনুযায়ী পরিবর্তন হয়। ভারতের কুটনৈতিক নীতি যথেষ্ট সফল। আমেরিকা, রাশিয়া ও ইউরোপের সাথে ভারতের বিদেশনীতি যথেষ্ট সফল। তবে বিগত কিছু বছর ধরে ভারত মধ্য প্রাচ্যে বিশেষ করে গল্ফ দেশ গুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ চেষ্টা করছে।

কেন গল্ফদেশ গুলো ভারতের জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ সেসম্পর্কেই বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

গল্ফদেশ কোন গুলো সেটা আগে বলা যাক। যেসব আরব দেশের সীমানা রয়েছে পারস্য উপসাগরের সাথে তাদেরই গল্ফ দেশ বলা হয়। ইরাক, কুয়েত, বাহরিন, কাতার, সৌদিআরব, ইউএই ও ওমান এই সাতটি দেশকে গল্ফ দেশ বলা হয়। এখানে একটা ব্যাপার আছে যে পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়া সত্বেও ইরানকে গল্ফদেশ বলা হয় না কারন ইরান আরবদেশ নয়, ইরানের সংস্কৃতি ও ভাষা আরব দেশ গুলোর থেকে আলাদা। ইরানের প্রধান ভাষা ফার্সি যেখানে আরবদেশ গুলোতে আরবি ভাষা প্রধান। ইরাক বাদে বাকি ছয়টি দেশের মধ্যে ১৯৮১ সালে একটি সংগঠন তৈরি হয়েছিল যার নাম জিসিসি বা গল্ফ কোঅপারেশন কাউন্সিল, একে আরবের ন্যাটে বলা হয়। আসলে ১৯৮১ সালে ইরান ও ইরাকের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যার কারনে গল্ফদেশ গুলো নিজেদের শক্তিশালী করতে জোট গঠন করেছিল যাতে তাদের উপর প্রভাব না পড়ে।

তবে ন্যাটো যেমন একটি সামরিক জোট জিসিস কিন্তু তেমন নয়। জিসিসি তৈরি হয়েছিল যাতে এই ছয়টি দেশ অর্থনৈতিক ভাবে আরও মজবুত হতে পারে পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। আরবদেশ গুলোর অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র হচ্ছে তেল বিক্রি কিন্ত আগামী ৫০ বছর পর তেলের পরিবর্তে কীভাবে নিজেদের আর্থিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব সে উদ্দেশ্যও এই জোট তৈরি হয়। এই গল্ফ দেশগুলো ভারতের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত থেকে ইউরোপে বানিজ্য করবার জন্য মধ্য প্রাচ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত থেকে আফ্রিকা হয়েও ইউরোপে যাওয়া যায় তবে এতে সময় বেশী লাগে, তবে মুম্বাই বন্দর থেকে সৌদি আরবের হাইফা বন্দর হয়ে ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানো যায়। প্রতিবছর ভারত ও গল্ফদেশ গুলোর মধ্যে বিলিয়ন ডলারের বানিজ্য হয়।

২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারত গল্ফ দেশগুলো থেকে ৭২ শতাংশ বা প্রায় ১১১ বিলিয়ন ডলারের জিনিস আমদানি করেছে এবং ২৮ শতাংশ বা ৪৪ বিলিয়ন ডলারের জিনিস রপ্তানি করেছে। সৌদি আরবের সাথে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বানিজ্য হয়েছে ভারতের ২০২১ সালে যার মধ্যে ৩৪ বিলিয়ন ডলার বা ৮০ শতাংশ আমদানি এবং ২০ তাংশ বা ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি। সৌদি আরব ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম বানিজ্যিক পার্টনার।

গল্ফদেশ গুলোর মধ্যে ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইউএই। আয়তনে সৌদি আরবের থেকে ইউএই অনেক ছোট কিন্তু এই দেশটির সাথে ভারতের সবচেয়ে বেশী প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারের বানিজ্য হয়। তবে এই অঞ্চলের সাথে ভারতের বানিজ্যিক ঘাটতি আছে অর্থাৎ আমদানি ও রপ্তানিতে সমতা নেই। ভারত যতটা রপ্তানি করে তার থেকেও বেশী আমদানি করে অর্থাৎ ভারতের বৈদেশিক রিজার্ভ এখানে বেশী খরচ হয়।

কিছুমাস আগেই ভারত ও ইউএইর মধ্যে সেফা চুক্তি বা কমপ্রিহেনসিভ ইকোনোমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট হয়েছে। এর ফলে উভয় দেশের মধ্যে বানিজ্য আরও বৃদ্ধি পাবে। এই চুক্তির জন্য ২০২৬ সালের মধ্যে উভয় দেশের বানিজ্য বেড়ে ১০০ বিলিয়ন ডলার হবে। আফ্রিকাতে বানিজ্য করার জন্য ইউএই একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ভারতের জন্য।

ভারতে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম দশটি দেশের মধ্যে ইউএই একটি। ভারত ও ওমানের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের বানিজ্য হয়। বাহরিন ও ভারতের মধ্যে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের বানিজ্য হয়৷ বাহরিন একমাত্র গল্ফ দেশ যেখানে ভারতের রপ্তানি আমদানির থেকে বেশী। কুয়েত ও ভারতের মধ্যে ১২.২৪ বিলিয়ন ডলারের বানিজ্য হয়। কাতারের সাথে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বানিজ্য হয়। ভারত তার প্রাকৃতিক গ্যাসের ৪১ শতাংশই কেনে কাতার থেকে। ভারত তার মোট বানিজ্যের ২০ শতাংশই গল্ফ দেশগুলোর সাথে করে। সেজন্য এই অঞ্চল ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত আরবদেশ গুলো থেকে মূলত ক্রুড অয়েল (৪০ শতাংশ),  পেট্রোলিয়াম গ্যাস (১৮ শতাংশ) ও হীরে (৮ শতাংশ) কেনে এবং সংশোধিত পেট্রোলিয়াম (১৪ শতাংশ), গয়না (৮ শতাংশ), চাল (৭ শতাংশ) রপ্তানি করে। ভারত প্রতিবছর তার দরকারের ৮৪ শতাংশ পেট্রোলিয়াম আমদানি করে বিশ্বজুড়ে ৪২ টি দেশ থেকে যার মধ্যে ইরাক থেকে সবচেয়ে বেশী তেল আমদানি হয় প্রায় ২২ শতাংশ। একটা সময় ইরান ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তেল রপ্তানিকারক দেশ ছিল কিন্তু আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারনে এই মহূর্তে ইরান থেকে এক শতাংশেরও কম তেল আমদানি হয়। সৌদিআরব থেকে ১৮ শতাংশ তেল কেনে ভারত।

বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বেশী রেমিট্যান্স ভারতে আসে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচুর ভারতীয় থাকে তারা প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমানে টাকা তাদের পরিবারকে পাঠায় একে রেমিট্যান্স বলে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী ভারত ২০২০ তে ৮৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে, দ্বিতীয় স্থানে আছে মেক্সিকো যাদের রেমিট্যান্স প্রায় ৪২.২ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ভারতের অর্ধেক। এই রেমিট্যান্সের ফলে ভারতের বৈদেশিক রিজার্ভে ডলারের পরিমান বাড়ে। গল্ফদেশ গুলোতে প্রায় ৮৯ লাখ ভারতীয় থাকে যার মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রায় ৩৫ লাখ ইউএইতে এবং ২৫ লাখ ভারতীয় সৌদিআরবে থাকে। ভারতের মোট রেমিট্যান্স ৮৩ বিলিয়ন ডলারের অর্ধেকের বেশী আসে গল্ফদেশ গুলো থেকে। অর্থাৎ এনার্জি, বানিজ্য ও রেমিট্যান্সের জন্য গল্ফদেশ গুলো ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ভারতই নয় চীনও গল্ফে নিজেদের কুটনৈতিক প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে, এর কারন হিসাবে চীন জানিয়েছে তাদের বেল্ট এন্ড রোড বা বিআরআই প্রজেক্টের জন্য আরবদেশ গুলো গুরুত্বপূর্ণ। সেইজন্য মধ্যপ্রাচ্যে ভারত ও চীনের মধ্যেও বিশ্বরাজনীতির নতুন সমীকরন তৈরি হয়েছে। তবে গল্ফদেশ গুলোরও ভারতকে দরকার। খুব বেশীদিন শুধু তেলের উপর নির্ভর করে থাকতে পারবেনা দেশগুলো। বিকল্প অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর জন্য আইটি প্রতিষ্ঠান, স্মার্ট শহর, মহাকাশ বিজ্ঞান সহ উচ্চশিক্ষার জন্য এইসব দেশগুলো ভারতের সাথে পার্টনারশিপ করছে। ভারতের অস্ত্র বাজারের জন্যও এই দেশগুলো উপযুক্ত। সৌদি আরব ও ইউএই ভারত থেকে ব্রাহ্মস মিসাইল কিনতে চলেছে।

এই ওয়েবসাইটের সকল লেখার দায়ভার লেখকের নিজের, স্বাধীন নিউজ কতৃপক্ষ প্রকাশিত লেখার দায়ভার বহন করে না।
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -