শিল্পীদের ছবিতে তুলিতে বৈষম্যের গল্প

রুহিনা ফেরদৌস

শিল্পী জান্নাতুল মাওয়ার ধারনকৃত আলোকচিত্র
ব্যস্ত সৈকতে মানুষের খুনসুটি। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ঢেউয়ে পা ভিজিয়ে আকাশ-সমুদ্রের বিশালতা বোঝার চেষ্টা করছেন। এসব কোলাহলের মধ্যে ক্যানভাসে রঙ সাজাতে ব্যস্ত একদল তরুণ শিল্পীর সঙ্গে দেখা হলো, দেখা হলো ক্যামেরা কাঁধে ছবির খোঁজে ছুটে চলা তরুণ আলোকচিত্রীদের সঙ্গেও।

এ দলে রয়েছেন আনিকা তাবাসসুম, আয়েশা তাসনিম, আকলিমা সুলতানা, ইমরান হোসেন, ফারিয়া রহমানসহ অনেকে। ওদের বয়স ২০, বড়জোর ২২ হবে। কেউ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পড়ছেন, কেউ এখনো স্কুলে। তবে কৈশোর পেরোনো এ ছেলেমেয়েদের ধারণকৃত আলোকচিত্র আর ক্যানভাসে আঁকা চিত্রকর্ম দেখলে তাদের বয়স বোঝা কঠিন। কারণ জীবনের এতটুকু অভিজ্ঞতা দিয়েই ওরা লিঙ্গসমতা, অভিবাসন সুরক্ষা কিংবা সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ছবি তুলতে ও আঁকতে শিখেছেন।

আর্টক্যাম্পে অংশ নেয়া শিক্ষানবীশ শিল্পীদের আঁকা চিত্র কর্ম

আকলিমা সুলতানা বিএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার আঁকা চিত্রকর্মের নাম নষ্ট নীড়। নাম নিয়ে জানতে চাইলে আকলিমার সরল স্বীকারোক্তি অনেকটা এমন, আমাদের সমাজে মেয়েরা কোনো দিকেই পরিপূর্ণ আশা দেখতে পায় না। বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থা তাকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ও বাধার মুখে ঠেলে দেয়। মেয়েরা সামনে অগ্রসর হতে চাইলে পিছুটান জুড়ে দেয়া হয়। তাই আকলিমার ছবির মেয়েটিও জড়সড় হয়ে বসে থাকে, তাকে ছুঁতে আসা হাতগুলোকে এড়াতে চায়।

আফিফা নিশাতের আলোকচিত্রটি অবশ্য নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের গল্প নিয়ে। সুই-সুতার চিরায়ত ছন্দ কিছু নারীর জন্য আজও উপার্জনের উপায়। আমাদের সমাজে এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যেখানে একা একজন নারী তার পূর্বপ্রজন্মের কাছ থেকে শেখা সূচিশৈলীর দক্ষতা পুঁজি করে জীবিকার বন্দোবস্ত করে যাচ্ছেন।

আফিফা নিশাতের আলোকচিত্রটি নারীর অর্থনেতিক ক্ষমতায়নের গল্প নিয়ে

কক্সবাজার সরকারি গার্লস স্কুলে আয়েশা তাসনিম নূরী পড়ছে দশম শ্রেণীতে। তার আঁকা চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু একজন নারী হিসেবে বেড়ে ওঠার প্রতিবন্ধকতাগুলো। আয়েশা যে সমাজে বাঁচে, সেখানে তার নিজের মতো পোশাক পরার স্বাধীনতা নেই বলে মনে করে। তাই আয়েশার ক্যানভাসের চরিত্রটি তার গলায় জড়ানো শেকল ছিঁড়ে ফেলতে চায়। এ শেকলই যেন আয়েশার গলায় জড়িয়ে থাকা অদৃশ্য পোশাক, আয়েশা যা তার গলায় জড়িয়ে রাখতে চায় না। ফারিয়া রহমান তারিনের আগ্রহ অবশ্য আলোকচিত্রে। তার ছবি তোলার বিষয়বস্তু সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন।

আমাদের সমাজের নারীরা আগের মতো এখন আর পিছিয়ে নেই। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। নারীরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বনির্ভর, স্বাধীনও। কিন্তু আনিকা তাবাসসুম রাহা একজন নারীর স্থায়ী ঠিকানার কথা বলছেন। ‘আ হাউজ অব হার ওন’ নামে রাহার আঁকা চিত্রকর্মে নারীর স্থায়ী ঠিকানার প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) পক্ষ থেকে সম্প্রতি তরুণদের মধ্যে লিঙ্গসমতা, অভিবাসন সুরক্ষা কিংবা সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম হিসেবে একটি আর্ট ক্যাম্প ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। আয়োজনটি করা হয় দুই ভাগে। প্রতিষ্ঠিত তিনজন আলোকচিত্রশিল্পী ও আটজন চিত্রশিল্পী সাতদিনের কর্মসূচির মাধ্যমে কক্সবাজারের স্কুল ও কলেজ-পড়ুয়া মোট ২১ জন শিক্ষার্থীকে ছবি আঁকা ও ছবি তোলার বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেন। ক্যাম্প প্রশিক্ষক ও অংশগ্রহণকারী আলোকচিত্রীদের মধ্যে ছিলেন জান্নাতুল মাওয়া, শামসুল আলম হেলাল ও রাসেল চৌধুরী।

আলোকচিত্রশিল্পী ও সমাজকর্মী জান্নাতুল মাওয়ার কাছে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারের কিশোর-কিশোরীদের জেন্ডার স্পর্শকাতর করার জন্য এ প্রয়াস। বিশেষ করে নারীর প্রতি সংহিসতা বন্ধে আলোকচিত্রের মতো একটি শক্তিশালী মাধ্যমে কেমন করে এ বিষয়গুলো জানা-বোঝার মাধ্যমে দেখতে হবে এবং তা ধারণ করে আনতে হবে সেসব নিয়ে ছিল কর্মশালা যাতে কিশোর-কিশোরীরা নারীর অধিকার বিষয়ে সচেতন হয়ে তা প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে পারে এবং তাদের কাজের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।’

প্রশিক্ষণে যে বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয় তার একটি যেমন তরুণ শিল্পীদের কারিগরি দক্ষতার উন্নয়ন, তেমনি অন্যটি হচ্ছে সমাজের বিদম্যান বৈষম্য আলোকচিত্র ও চিত্রকর্মের মাধ্যমে কীভাবে তুলে ধরতে হবে সে-বিষয়ক ধারণা দেয়া।

এ প্রসঙ্গে চিত্রশিল্পী ও আর্ট ক্যাম্পের প্রশিক্ষক মিন্টু দে মনে করেন, ‘শিশু বা কিশোররা কোনো নির্বাচিত বিষয় নিয়ে ছবি আঁকে না। তবে আর্ট ক্যাম্পে এসে তারা যখন লিঙ্গসমতা, নারীর ক্ষমতায়নের মতো বিষয়বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হয়েছে তখন তারা তাদের ছবির মাধ্যমে পরিবার, সমাজ থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠীদের মধ্যেও বিষয়গুলো ছড়িয়ে দিতে পারবে।’ আর্ট ক্যাম্পে অংশ নেয়া অন্য প্রশিক্ষক চিত্রশিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন আবু সালেহ কাজল, ফারজানা আহমেদ ঊর্মি, আইরীন খান, তর্পণ পাল, ফেরদৌস আরা রসুল, মো. ওবাইদুল্লাহ আল মামুন ও আরিফুর রহমান তপু।

শিল্পী ঊর্মির আঁকা চিত্রকর্ম
চিত্রশিল্পী ফারজানা আহমেদ ঊর্মি বলেন, আমাদের সমাজের সবকিছুই যেন ভেঙে পড়ছে। নারী, পুরুষ, শিশু, বিভিন্ন সম্প্রদায়ও এ ভাঙনের অংশ। কিন্টসুগি বলে জাপানের একটি পদ্ধতি আছে, যেখানে ওরা ভাঙা পাত্রকে সোনালি, রুপালি বা অন্য ফয়েল দিয়ে জোড়া লাগায়। আমার চিত্রকর্মে ভাঙা টুকরোগুলোকে আমি জোড়া দিতে চেয়েছি। ইতিবাচকভাবে।

আর্ট ক্যাম্পে নির্ধারিত বিষয়বস্তুর ওপর প্রশিক্ষক শিল্পীদের পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণ শিল্পীরা দুটি করে ছবি আঁকেন এবং আলোকচিত্র ধারণ করেন। এরপর শিল্পী ও বিচারকদের পক্ষ থেকে তাদের কাজ বাছাই করে ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়।

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -