শিশু : আইনি ও ইসলামী দৃষ্টিকোণ

0
53

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

শিশু মানব সভ্যতার রক্ষা কবচ। ইসলামী জীবন দর্শনে মানব সন্তান তথা মানব শিশু হচ্ছে মহান আল­াহর পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ামত ও আমানত। এ মানব শিশু পৃথিবীর আলোয় আগমনের পূর্ব থেকেই অনেকগুলো মৌলিক অধিকার নিয়ে জন্মলাভ করে। শিশুর অধিকার প্রদান ও সুরক্ষায় ইসলামী আইন ও দর্শন আপোষহীন। আজকের জাতিসংঘ বা বিশ্ববিবেক শিশুদের যে সব অধিকার ও সুরক্ষার সনদ বা নীতি প্রণয়ন নিয়ে ভাবছে- সে সব বিষয় এবং শিশুর জন্য আরো অনেক কল্যাণকর বিষয় নিয়ে ইসলাম ঈসায়ী সপ্ত শতাব্দীতেই পরিপূর্ণ নীতিদর্শন উপস্থাপন করেছে। আজও বিভিন্ন দেশ-জাতি ও সমাজ শিশুর পরিচয় ও বয়সসীমা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে শিশুর পরিচয়, আইনী ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রামাণ্য পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে মানব সভ্যতার রক্ষাকবচ হিসেবে শিশুর গুরুত্ব, মর্যাদা ও অবস্থান এবং শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের বাস্তবানুগ ভূমিকা প্রমাণ করা হয়েছে।

শিশুর পরিচয় ঃ প্রত্যেক মানব শিশু মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে পিতামাতা এবং মানবজাতির জন্য নিয়ামত। পৃথিবীতে মানব জাতি আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি। মানব জাতির বংশধারা সুরক্ষার জন্য মানব-মানবীর বৈধ দাম্পত্য জীবনের ফসল হচ্ছে মানব শিশু। এ শিশুরাই মানব সভ্যতার রক্ষাকবচ, মানব প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এবং পিতামাতা ও উম্মাহ’র সমৃদ্ধ জীবনের আশার আলো। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ‘‘ধন-সম্পদ ও শিশু-সন্তান পার্থিব জীবনের শোভা।’’ ‘‘আল-কুরআন, ১৮:৪৬’’
এই মানবশিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব থেকেই কতিপয় মৌলিক অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে। ইসলাম শিশুর সেই সব অধিকার সুরক্ষায় নিশ্চয়তা প্রদান করে। শিশুর অধিকার প্রদান ও সংরক্ষণে ইসলামী জীবন-বিধান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে তথা ইসলামী জীবন-দর্শনে মানব শিশুর জন্মের পবিত্রতা, নিরাপত্তা, প্রতিপালন, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং আদর্শ মানবরূপে গড়ে তোলার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছে। শিশুর অধিকার বিষয়ে আরোকপাত করার পূর্বে এ শিশুর পরিচয় তথা শিশু কাকে বলে বা কত বছর বয়স পর্যন্ত মানব সন্তানকে শিশু বলা হবে সে সম্পর্কে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। শিশু শব্দের আভিধানিক অর্থ- মানুষের শাবক। ‘‘জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস-এর ‘বাংলা ভাষার অভিধান’ এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ প্রভৃতিতে শিশু বলতে বোঝানো হয়েছে অনূর্ধ্ব আট কিংবা ষোল বছরের বালক, পরবর্তীকালে সমবয়সী বালক-বালিকাসহ অনুর্ধ্ব ১৬ বছরের মনুষ্য সন্তানকে। তবে উইলিয়াম কেরীর ‘Dictionary of Bengali Language’- এ শিশুকে ‘ইনফ্যান্ট’-এর সমার্থক বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘‘শিশু Form kk & to go by leaps, a child, an infant, a boy under eight years of age.’’ লিসানুল ‘আরব’ গ্রন্থে শিশু অর্থ করা হয়েছে ‘‘প্রত্যেক বস্তুর ছোটকে শিশু বলা হয়।’’ পরিভাষায়- ‘‘মায়ের গর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে স্বপ্নদোষ হওয়া পর্যন্ত বয়সকালীন মানবসন্তানকে শিশু বলে। ‘‘ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, প্রাগুক্ত, খ, ১১, পৃ. ৪০১’’ বিশ্বে সর্বজন স্বীকৃত Shorter Oxford English Dictionary- তে শিশুর অর্থ বলা হয়- Childhood: The state or stage of life a child. The time during which one is a child the time from birth to puberty. ÔÔShorter Oxfort English Dictionary, Vol-1, 15th Edition, A-M, Newyork. Oxford University Press, 1993. P. 394.’’
শিশু সামগ্রিক সংজ্ঞা নির্ণয়ে ও নিরূপণে জাতীয় নীতি, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ এবং জাতিসংঘ প্রদত্ত সংজ্ঞায় পার্থক্য দেখা যায়। জাতিসংঘ সনদের ধারা-১ এ ১৮ বছরের কম বয়সী প্রত্যেককেই শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ‘‘ইসলাম, ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল সম্পাদিত, বাংলাদেশের শিশু ও তাদের অধিকার, ঢাকা: ইউনিসেফ বাংলাদেশ, ১৯৭৭, পৃ. ৯।’’ তাই শিশু সম্পর্কিত সকল আইন, নীতি ও অনুশীলন এ বয়সের মানব সন্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তাই ১৮ বছরের নিচে শিশু; যদি না দেশের আইন আরো কম বয়সের ব্যক্তিকে সাবালক হিসেবে অনুমোদন করে। ‘‘ক্লাস্টার, রাইটস, শিশু অধিকার, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, ঢাকা: ইউনিসেফ, ১৯৯২, পৃ. ৮।’’
বাংলাদেশে জাতিসংঘ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী বর্তমান পরিসংখ্যান অনুসারে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪৮ ভাগ শিশু। অর্থাৎ, বাংলাদেশে শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৯৫ লাখ। এ সংজ্ঞা অনুযায়ী শিশু সম্পর্কিত সকল আইন, নীতি ও চর্চা ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। কিন্তু বাংলাদেশে তেমনটি হচ্ছে না। এখানে সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবার মত শিশুর কোনো একক সংজ্ঞা নেই। বিভিন্ন নীতি ও আইনের মধ্যে এ সজ্ঞায় তারতম্য রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, বাংলাদেশের জাতীয় শিশু নীতিতে কেবল ১৪ বছরের কম বয়সীদের শিশু ধরা হয়েছে। শিশুদের সুরক্ষাদানকারী সংবিধিবদ্ধ আইনসমূহের (যেমন, কাজ সম্পর্কিত) অধিকাংশতেই যে বয়স পর্যন্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে তা ১৮ বছরের বেশ নিচের, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্র ১১ বছর পর্যন্ত। আর একটি বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক ধারণা এই যে, ১৮ বছর বয়সের অনেক আগেই শৈশব কালের সমাপ্তি ঘটে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের সঙ্গে এসব অসামঞ্জস্য এবং সংবিধিবদ্ধ বিভিন্ন আইন ও নীতির মধ্যে এ ধরনের অসঙ্গতির অর্থ হচ্ছে, অনেক শিশুই সনদ অনুসারে সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে; যদিও তাদের সেটি পাওয়ার কথা।
তাছাড়া বাংলাদেশের শিশু বিষয়ক বিভিন্ন নীতি, সংবিধি ও ধর্র্মীয় আইনে দেয়া শিশুদের বয়সভিত্তিক সংজ্ঞার সাথে গরমিল দেখা যায়। বাংলাদেশে শিশুদেরকে বিভিন্ন বয়স স্তরে (১৮ বছরের অনেক নিচে) কতিপয় নীতি ও বিধির অধীনে নিম্ন বর্ণিত বিশেষ কিছু সুরক্ষা বা সুযোগ-সুবিধা দেয়া আছে। * ৭ বছরের নিচের শিশু : কোনো অপরাধের দায়িত্ব আরোপ করা হয় না। * ৬-১০ বছরের শিশু : সব শিশুকে স্কুলে পাঠানোর বিধান আছে। * ১২ বছরের নিচের শিশু: দোকান, অফিস, হোটেল বা কোনো ওয়ার্কশপের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। শিক্ষানবীশ ব্যতীত) * ১৪ বছরে নিচের শিশু : কলকারখানার কাজে ব্যবহার করা যাবে না। ভবঘুরেদের প্রাপ্ত বয়স্কদের কাছ থেকে পৃথক রাখতে হবে। জাতীয় শিশুনীতির আওতায় অধিকার সংরক্ষিত।* ১৫ বছরের নিচের শিশু: পরিবহণ খাতের কয়েকটি অংশের কাজের ব্যবহার করা যাবে না। * ১৬ বছরে নিচের শিশু: সাধারণ কারাগারে আটক রাখা যাবে না। মৃত্যুদন্ড দেয়া যাবে না। মেয়েরা যৌন মিলনে সম্মতি দিতে পারবে না। * ১৮ বছরের নিচের শিশু : মেয়ের বিবাহ আইনসিদ্ধ হবে না।* ১৮ বছর বয়সে : প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচিত হবে। ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। * ২১ বছরের নিচে: ছেলে বিবাহ আইনসিদ্ধ হবে না। * ধর্মীয় আইনের ক্ষেত্রে: বয়:সন্ধি লাভের পর থেকেই অর্থাৎ, মেয়েদের ১২ বছর ও ছেলেদের ১৫ বছর বয়সে শৈশবের সমাপ্তি ঘটে। ‘‘ইসলাম, ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল সম্পাদিত, বাংলাদেশের শিশু ও তাদের অধিকার, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০।’’
জাতিসংঘ প্রদত্ত এবং বাংলাদেশের জাতীয় শিশুনীতির আলোকে শিশুর সাথে ইসলাম প্রদত্ত শিশুর সংজ্ঞায় আপাত দৃষ্টিতে পার্থক্য দেখা যায়। এ পার্থক্যের ক্ষেত্রটি হচ্ছে- ছেলে-মেয়ের বিবাহের বয়স। এরই নিরিখে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ছেলে বা মেয়ের বিবাহের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স-পরিমাণ আছে কিনা? বিবাহের জন্য কত বয়স হওয়া উচিত? তাছাড়া সরকারী আইনের মাধ্যমে ছেলে-মেয়েদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নিম্নতম বয়সসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়ার ব্যাপারে ইসলামের অভিমত কি? আধুনিক সমাজ-মানসে এ এক জরুরি জিজ্ঞাসা। কুরআন, হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবে শিশুর বয়সসীমার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা খতিয়ে দেয়া যেতে পারে। আয়েশা রা.-এর উক্তি থেকে কিছুটা ধারণা লাভ করা যায়। তিনি বলেন- ‘‘রাসূলুল্লাহ স. আমাকে বিবাহ করেন, যখন আমার বয়স মাত্র ‘ছয়’ বছর। আর আমাকে নিয়ে ঘর বাঁধেন যখন আমি ‘নয়’ বছরের মেয়ে। ‘‘মুসলিম, ইমাম, আস-সহীহ, অধ্যায়: বৈরূত, ইহইয়াউত্ তুরাসিল আরাবি, তা, বি, খ,২, পৃ. ১০৩৯।’’
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখেন- ‘‘নবী স, ‘আয়েশা রা.-কে বিবাহ করেছিলেন যখন তিনি ছোট ছিলেন। তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর।’’ ‘‘আইনী, বদরুদ্দীন, উমদাতুলকারী, ইউপি: যাকারিয়া বুক ডিপো, ২০০৩, খ. ২০, পৃ. ৭।’’ মহানবী স. নিজে যখন আয়েশা রা-কে ‘ছয়’ মতান্তরে ‘নয়’ বছর বয়সে বিবাহ করলেন, এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইসলামে ছেলে-মেয়ের বিয়ের জন্য কোনো নিম্নতম বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। যে কোনো বয়সের ছেলে-মেয়েকে যে কোনো বয়সে বিবাহ দেয়া যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ‘আল্লামা আইনী র. ইবনে বাত্তালের নিম্নোক্ত অভিমত উদ্ধৃত করেন- ‘‘ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, পিতার পক্ষে তার মেয়ের বিবাহ দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয-বৈধ, সে মেয়ে দোলনায় শোয়া শিশুই হোক না কেন। তবে তাদের স্বামীদের পক্ষে তাদের নিয়ে ঘর বাঁধা কিছুতেই জায়েয হবে না যতক্ষণ তারা যৌন কার্যের জন্য পূর্ণ পুরুষ গ্রহণ ও ধারণ করার সামর্থ্য সম্পন্ন না হচ্ছে।’’ এ প্রসঙ্গে ইমাম নববী র. লিখেন: ‘‘পিতার পক্ষে তার কুমারী (নাবালেগ) মেয়েকে বিবাহ দেয়া জায়েয হওয়ার ব্যাপারে মুসলমানগণ একমত হয়েছেন।’’ ‘‘ইমাম নববী, আবূ যাকারিয়য়্যাহ মহীউদ্দীন ইবনে শারফ, শারহু সহীহ লি-মুসলিম, তা. বি., খ. ১, পৃ. ৪৫৬।’’ কাজেই মেয়েদের বা ছেলেদের বিবাহের ব্যাপারে কোনো বয়স নির্দিষ্ট করা যায় না। এ জন্য যে, সব মেয়ে শারীরিক অবস্থাও দৈহিক শক্তি-সামর্থের দিক দিয়ে সমান হয় না।