সিলেটে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে হোটেল রোজ ভিউ বিক্রি, নেপথ্যে সাব-রেজিস্ট্রার পারভিন

0
24

রুবেল আহমদ সিলেট প্রতিনিধিঃ

সিলেটে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পাঁচতারকা মানের হোটেল রোজ ভিউ বিক্রি হয়েছে মাত্র সাড়ে তিন কোটি টাকায়। সিলেটের জনপ্রিয় এই হোটেলটির মূল্য অর্ধশত কোটি টাকা হলে শুধুমাত্র সরকারের কয়েককোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিতেই এমনটি করা হয়েছে। তবে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে এই অনিয়ম করা হলেও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিলেটের সাব-রেজিস্টার পারভীন আক্তার। তিনি বলছেন নগরীর উপশহর রোজভিউ হোটেল বিক্রিতে কোন অনিয়ম হয়নি!

সূত্রে জানা গেছে, সিলেট সদর সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে ১৮৮২/২১ ইং নম্বর দলিল মূলে বিক্রি করা হয় সিলেটের রোজ ভিউ হোটেল। হোটেলটির জায়গা ও ভবনের মূল্য সরকারী হিসেবে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন একাধিক দলিল লেখক ও আইনজীবীরা। কিন্তু দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে শুধু জায়গার মূল্য নির্ধারণে তিন কোটি ৫১ লক্ষ ৯ হাজার ৩ শত ৬০ টাকা মূল্যে। ৫ থেকে ৭ লাখ টাকার কারণে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে প্রায় কয়েক কোটি টাকা!

তবে সিলেট সদর সাবরেজিস্ট্রার পারভিন আক্তার জানান, তিনি কোন দুর্নীতিতে জড়িত নন, এ দলিলটি করা হয়েছে জেলা রেজিস্ট্রার, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দুই আইনজীবী, দলিল লেখক সমিতির নেতা ও একজন নকল নবিশের সাথে পরামর্শ করে। এদিকে হোটেল রোজ ভিউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তারা হোটেল বিক্রি করেননি। তাহলে এই দলিল কিভাবে সম্পাদন হল?

সম্পাদিত দলিল সূত্রে জানা গেছে, সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত সিলেটের এই পাঁচ তারকা নামে পরিচিত হোটেল রোজ ভিউ। জায়গার পরিমাণ ৪৮ শতক ৩৬ পয়েন্ট। এ হোটেলটি সাদিপুর ২য় খন্ড মৌজার জে,এল নং, এস, এ ৯৮, বি, এস ৭৯, উপজিলা সদর, জেলা সিলেট। চলতি বছরের ২১ মার্চ এ জায়গা ও হোটেলটি বিক্রি করেন মঈন উদ্দিন, মহি উদ্দিন, কবির উদ্দিন, মিজান উদ্দিন গং।

গত ২১ মার্চ দলিল লেখক ইব্রাহিম আলী খোকন রেজিস্ট্রিকৃত ১৮৮২/২১ ইং নম্বর সাফ কবালা হস্তান্তর দলিলে উল্লেখ করেন, সিলেট সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিস, সিলেট সদর। দলিলের সার সংক্ষেপ দলিলের প্রকৃতি সাফ কবালা। সিলেট সিটি করপোরেশন ২৩ নম্বর ওয়ার্ড। হস্তান্তরিত সম্পত্তির পরিমাণ ০.৪৮৩৬ একর বা ৪৮ শতক ৩৬ পয়েন্ট। জায়গার শ্রেণী দোকান। ৩ কোটি ৫১ লক্ষ ৯ হাজার ৩ শত ৬০ টাকা মূল্যে দলিলটি রেজিস্ট্রি করেন সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রার পারভিন আক্তার।

সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রার পারভিন আক্তারকে নিয়ন্ত্রণ করেন ওই অফিসের একজন পুরুষ নকল নবিশ ও দলিল লেখক সমিতির এক নেতা। ওই দুইজন মিলে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করানোর জন্য অনিয়মের আশ্রয় নেন দলিল লেখক ইব্রাহিম আলী খোকনের সাথে। পর্যায়ক্রমে সেই নকল নবিশ ও দলিল লেখক সমিতির নেতার কুকর্ম প্রকাশ করা হবে।

এরপর সাব-রেজিস্ট্রার পারভিন আক্তারের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত ওই নকল নবিশ ১৮ মার্চ সন্ধ্যায় দলিল রেজিস্ট্রির বিষয়টি পাকাপোক্ত করেন। এরপর ২১ মার্চ সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে ১৮৮২/২১ ইং নম্বর দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়।

সূত্র জানায়, এর আগেও দলিল লেখক ইব্রাহিম আলী খোকন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৮টি সীল-স্বাক্ষর জালিয়াতি করে সিলেটে এক প্রবাসীর নামে আমোক্তারনামা জাল করতে গিয়ে আটক ইব্রাহিম আলী খোকন নামে এক দলিল লেখক। তবে আটকের পর সিলেটের সাব-রেজিস্ট্রার তাকে পুলিশে সোপর্দ করেননি! ইব্রাহিম আলী খোকন (সনদ নং ২৯০/২০১০)।

সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দলিল লেখক জানান, রোজ ভিউ হোটেল একটি কমার্শিয়াল ভবন। আর সাদিপুর ২য় খন্ড মৌজার দাম বর্তমানে ৮ থেকে ১৪ লক্ষ টাকা। কমার্শিয়াল ভবনে স্কয়ার ফুট অনুযায়ি ও জায়গার মূল্য অনুসারে তা সাফ কবালা দলিল নির্ধারণে বিক্রি হলে সরকারকে সাড়ে ১২ শতাংশ হারে রাজস্ব দেয়ার কথা। যেহেতু, তিন কোটি ৫১ লক্ষ ৯ হাজার ৩ শত ৬০ টাকা বিক্রয় মূল্য নির্ধারণে দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছে, সেহেতু, শুধু জায়গার মূল্য দেয়া হয়েছে। আর সরকারকে ৭ থেকে ৮ শাতাংশ রাজস্ব দেয়া হয়েছে। এতে করে সরকারের ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি টাকা।

এ ব্যাপারে হোটেল রোজ ভিউ এর মালিক মহি উদ্দিন জানান, তারা হোটেল বিক্রি করেননি। বিষয়টি তার জানা নেই বলে মন্তব্য করেন।

সিলেট সদর সাবরেজিস্ট্রার পারভিন আক্তার বলেন, আমি ভেতরের কথা বলতে যাবো না। এই দলিলটি ডিআর স্যার, আগের ডিআর স্যার দেখেছেন। আর অনেক যাচাই-বাছাই করে দলিলটি করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, তিনি সরকারের চাকরী করেন। তিনি কেন সরকারের টাকা মারতে যাবেন। তিনি সম্পূর্ণ ‘সেইভ সাইটে’ আছেন। উপরের নির্দেশে এই দলিলটি করেছেন।