সড়ক দুর্ঘটনা: জবাবদিহিতার অনুশীলন নেই, আছে শুধু দায়মুক্তির সংস্কৃতি

ড. রায়হানা শামস্ ইসলাম

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুসারে গত দুই দশকে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৫৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সম্প্রতি এমন এক দুর্ঘটনায় পরপর দুজন ছাত্র নিহতের ঘটনায় ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। এর আগেও ২০১৮ সালে দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল। সেই অভূতপূর্ব আন্দোলনের ফলে সংসদে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ পাস করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার গতি রোধ করা যায়নি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে সড়কে ৬ হাজার ৬৮৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। করোনার বছর (২০২০) জনচলাচল কম থাকার পরেও দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ২২১ ও ৭ হাজার ৮৫৫। এআরআইয়ের হিসাবমতে গত তিন বছরের সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতি ১ লাখ ৪৫৩ কোটি টাকা (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন ২১.১০.২১)। তা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলনের দাবি অনুযায়ী প্রণীত আইন সম্পূর্ণ কার্যকর করা হয়নি। পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধনের দাবি করা হয়েছে। যেমন ১০৫ নম্বর ধারায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এমন দুর্বল ধারারও জরিমানা সংশোধন করে ৩ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে (সূত্র: ডয়েচে ভেলে ২৫.১১.২১)। অথচ আইন ও তার প্রয়োগ এমন কঠোর হওয়া প্রয়োজন যেন তা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে, ড্রাইভারদের দায়িত্বশীল আচরণে বাধ্য করে। একমাত্র তবেই দুর্ঘটনা হ্রাস করা সম্ভব হতে পারে।

রাস্তায় লাইসেন্সহীন যানবাহনের ছড়াছড়ি, অনিরাপদ সড়ক যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ‘ট্রাফিক সপ্তাহে’ হয়তো কিছু লাইসেন্স পরীক্ষা করা হয়, তারপর আবার যেই কে সেই! ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে ৩৫ লাখ নিবন্ধিত ও ২০ লাখ নিবন্ধনহীন যানবাহন বিদ্যমান ছিল। এই মোট সংখ্যার মাত্র ৪৮ শতাংশ ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু হয়েছিল (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার ৪.৮.১৮)। এর মধ্যে ভুয়া নিবন্ধনপত্র বা ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই লাইসেন্স থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তাকে ড্রাইভিং দক্ষতার সঠিক মাপকাঠি ভাবা ঠিক হবে না। বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স কিনতেও পাওয়া যায়! প্রবাসী সন্তানের জন্য বাংলাদেশ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স ‘জোগাড়’ করে ডাকযোগে পাঠাতে আমি নিজের চোখে দেখেছি!

সড়কে শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিই নয়, বরং রাস্তায় বের হওয়া মানেই প্রবল শব্দদূষণের মধ্যে পড়া; কারণ অত্যন্ত জোরালো হাইড্রোলিক হর্নের অনাবশ্যক ও অত্যধিক ব্যবহার। প্রতিনিয়ত এই অত্যাচারের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করার ফলে আমাদের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ যে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে, এর পেছনে এটাও একটা কারণ বৈকি! অথচ হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

হাইওয়েতে প্রায়ই ছোট যানের সঙ্গে দূরপাল্লার বড় বাস বা ট্রাকের সংঘর্ষে বড় দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। খারাপ রাস্তা, স্পিডিং, ভুলভাবে ওভারটেক করা, সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা বহন, পরপর দুই দফা ড্রাইভিংয়ের মাঝে ড্রাইভারের পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ না থাকা, ছোট যানগুলোর যত্রতত্র নড়াচড়া, মানুষ ও গবাদি পশুর হঠাৎ রাস্তা পার হওয়া ইত্যাদি দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দেখা যায়। আমাদের রাস্তায় শুধু মানুষ আর যানবাহনই থাকে না, গরু, ছাগল, মুরগি, কুকুর ইত্যাদিও থাকে! একটি ছাগলকে বাঁচাতে গিয়ে যাত্রীবাহী বাস খাদে উল্টে পড়েছে, এমন ঘটনাও ঘটে!

হাইওয়ে আর শহরের ব্যস্ত রাস্তার অ্যাকসিডেন্টের মধ্যে ধরনে ও কারণে কিছু ভিন্নতা আছে। শহরাঞ্চলে ড্রাইভার ও পথচারী উভয়ের গাফিলতিতে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অদক্ষ ও বেপরোয়া ড্রাইভার তো প্রচুর আছেই, শহরে এর পাশাপাশি রয়েছে অসাবধানী পথচারী। অনেকেই সময় বাঁচানোর অভিপ্রায়ে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করে না এবং প্রায়ই অনিরাপদভাবে রাস্তা পার হয়। ফুটপাত ব্যবহারে মানুষের অনীহা আছে। মানুষজন পার্কে বেড়ানোর মতো নিশ্চিন্ত চিত্তে রাস্তায় হাঁটে, হর্ন দিলেও সহজে সরতে চায় না। রাস্তার দিকে শিশুকে রেখে অভিভাবক হাঁটছে বা রিকশার ডান পাশে শিশুকে বসিয়েছে, এমন হরদম দেখা যায়। মোটরসাইকেলে হেলমেটহীন শিশুযাত্রী কতবার দেখেছেন? রিকশা বা অটোতে চড়ে পা বাইরে বের করে বসে থাকা কিংবা রাস্তার ভুল দিকে যানবাহন থেকে ওঠানামা করা, এসব সচরাচর দৃশ্য। রাজশাহীতে আজকাল ‘উল্কা’ বা অটোতে যাত্রীনিরাপত্তার খাতিরে ডান পাশে সেইফটি রডের প্রচলন করা হয়েছে এবং এর প্রয়োগ ব্যাপকভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

আসলে আমাদের জাতিমানসেও নিরাপদ জীবনযাত্রার ধারণাগুলো স্পষ্ট নয়। যেমন ছোট শিশু আছে যে বাড়িতে, সেখানেও দেখবেন টেবিলের কিনারে চায়ের কাপ রেখে আগুন-গরম চা খাওয়া হয়। বাচ্চা পিরিচে একটা টান দিলেই গরম চা গিয়ে পড়বে সোজা তার চোখেমুখে! কাজের মাঝে রান্নাঘরের ধারালো বঁটি খাড়া অবস্থায় রেখে উঠে যাওয়া নারীদের এক বিপজ্জনক অভ্যাস। শীতকালে গোসলের গরম পানি বালতিতে করে না এনে দুই হাতে হাঁড়িতে ধরে বহন করা খুব প্রচলিত; ধাক্কা লেগে নিজের বা শিশুর গায়ে পানি পড়ে পুড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এখানে মাত্র কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছি, এমন আরো অনেক আছে। যেকোনো ধরনের সেফটি সচেতনতাকে সমাজের অনেকেই মনে করেন সাহসের অভাব বা নিয়মের বাড়াবাড়ি! এ ধরনের উদাসীনতা থেকে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনা ঘটে।

এমন আরেকটি হলো আগুন লাগা। গত দুই দশকে আমাদের দেশে অগ্নিদুর্ঘটনা তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন ২৬.২.১৯)। এ সময়ে প্রায় আড়াই লাখ আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে দেশজুড়ে। এসব দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আগুন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যাও কম নয়। অথচ এর অধিকাংশই এড়ানো সম্ভব ছিল। অপরিকল্পিত শহরায়ণ, অনুমোদনহীন স্থাপনা তৈরি, বৈদ্যুতিক সার্কিট ও যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অনিরাপদ গ্যাস পাইপলাইন ও গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার, দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ সংরক্ষণে চরম গাফিলতি ইত্যাদি কারণ দেখানো সম্ভব। এক্ষেত্রে মূলত কর্তৃপক্ষের অবহেলাই আগুনে ঘি ঢালার সমার্থক ভূমিকাটি রাখে। তবে জনসাধারণের অসচেতনতাও বিপদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এর একটি নিখুঁত উদাহরণ হতে পারে নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনাটি। মসজিদটি অনুমোদনহীনভাবে নির্মিত। মেঝের নিচের গ্যাস পাইপলাইন সমস্যাজনক অবস্থায় ছিল। গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও মসজিদ কর্তৃপক্ষ উভয়েই ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত ছিল কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আবার মুসল্লিরাও গ্যাসের গন্ধ পাওয়া সত্ত্বেও সক্রিয় হননি। সবকিছুর সমন্বয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সংঘটিত হয়েছে। তাই নিজেদের জীবন রক্ষার্থে যেকোনো পরিবেশ বা পরিস্থিতির সম্ভাব্য ঝুঁকি বা বিপদ সম্পর্কে নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার দরকার আছে।

যেকোনো স্থাপনার নির্মাণকার্য পর্যবেক্ষণ করলে আপনি দেখবেন নির্মাণ শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ কতটা অনিরাপদ! প্রাণহানিসহ বহু দুর্ঘটনা ঘটে, যেগুলো প্রায় ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ করা যেত। কিছুদিন আগে এক রাস্তা দিয়ে যেতে গিয়ে রাস্তাজুড়ে ভিড়ের মধ্যে পড়লাম, সবাই ওপরে তাকিয়ে কী যেন দেখছে! তাকিয়ে দেখি বাঁশের মাচার ওপর লাশ ঝুলছে—ইলেকট্রিক লাইনের খুব কাছে নির্মাণকাজ করতে বাধ্য হয়ে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হওয়া এক হতভাগ্যের মরদেহ! কারো কোনো দায় নেই! নির্মাণাধীন ভবন ধসে, ভবন থেকে পড়ে অগণিত শ্রমিকের মৃত্যুর দায় যেমন কারো থাকে না!

বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনার তালিকা লিখতে গেলে সহসা শেষ হবে না। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটছে, আমরা চেয়েও দেখি না সাধারণত। রানা প্লাজা, তাজরীন গার্মেন্টস, সজীব ফ্যাক্টরি বা লঞ্চ দুর্ঘটনার মতো বড় আকারের বিপর্যয় হলেই তবে আমরা কিছু সময়ের জন্য নড়েচড়ে বসি। অনেক আলোচনা, সমালোচনা, দিকনির্দেশনা আসে; শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ অবশ্য কিছুই হয় না। কারণ জবাবদিহিতার অনুশীলন নেই, আছে শুধু দায়মুক্তির সংস্কৃতি। সে কারণেই জারি আছে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অবহেলা ও গাফিলতি। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের জীবনের মূল্য যখন থাকে না, নাগরিকরা মানুষ না হয়ে যখন শুধুই একেকটি নগণ্য সংখ্যায় পর্যবসিত হয়, তখন প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনাগুলো এভাবেই বারবার বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে থাকবে। সদিচ্ছা, সচেতনতা, পরিকল্পনা ও সক্রিয়তার মাধ্যমে সম্পূর্ণ একটি প্যারাডাইম শিফট ঘটাতে না পারলে সড়ক দুর্ঘটনাই বলুন কিংবা অন্যান্য, এসবের সংখ্যা বা মাত্রা কমানো সম্ভব হবে না।

ড. রায়হানা শামস্ ইসলাম: প্রফেসর, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment -