advertisement

প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও নির্বিঘ্ন হস্তান্তর নিশ্চিত করা হোক

স্বাধীন নিউজ ডেস্ক,

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি হিসেবে সরকার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে শিল্পের বিকাশ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী বাহিনী তৈরি ও পরিবেশ সংরক্ষণে জোর দিচ্ছে। শনিবার ‘ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের তাল মিলিয়ে চলা হবে সবচেয়ে কঠিন। এজন্য প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে প্রযুক্তির সহজলভ্য ও পর্যাপ্ত হস্তান্তর নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন। সরকার শিল্প বিপ্লবের আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিভিন্ন সময়োপযোগী নীতি ও ব্যবস্থা গ্রহণও করছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের অদক্ষতায় সুফল থেকে বৃহৎ জনগোষীম বঞ্চিত থাকছে। এতে প্রযুক্তিগত বৈষম্য বাড়ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও এর সুফল সব অংশীজনের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও তার নির্বিঘ্ন হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে উদ্ভাবনের গতি ও বাধা-বিপত্তির গতি-প্রকৃতি কী হারে বাড়বে তা এখনো সংশ্লিষ্টরা উপলব্ধি করতে পারছেন না। এমনকি যারা প্রযুক্তির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িত, তারাও তা অনুধাবনে হিমশিম খাচ্ছেন। অবশ্য পুরো প্রযুক্তি শিল্পজুড়ে স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি রচনাকারী প্রযুক্তির বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে ব্যবসার ওপর। সরবরাহের ক্ষেত্রে, অনেক শিল্প খাতই নতুন প্রযুক্তি সূচনার কথা ভাবছে, যা বিদ্যমান চাহিদা পূরণ করবে পুরোপুরি নতুন উপায়ে এবং বর্তমান ভ্যালু চেইনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। এ কাজ আরো ক্ষিপ্রগতির হতে পারে উদ্ভাবনমূলক প্রতিযোগীদের মাধ্যমে। এরা গ্লোবাল ডিজিটাল রিসার্চ, ডেভেলপমেন্ট, মার্কেটিং, সেলস প্লাটফর্মের সুবাদে তাদের মান, গতি উন্নয়ন ও সরবরাহ মূল্য কমিয়ে এনে আরো দ্রুত সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিপক্ষকেও পরাভূত করতে পারবে। চাহিদার ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে চলেছে। কারণ স্বচ্ছতা বাড়ছে, ভোক্তার সম্পৃক্ততা বাড়ছে এবং ভোক্তার আচরণের ধরনও পাল্টাচ্ছে। ফলে কোম্পানিগুলো বাধ্য হচ্ছে পণ্য ও ডিভাইসের ডিজাইন, বিপণন ও সরবরাহে নয়া উপায় অবলম্বনে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের একটি মুখ্য প্রবণতা হচ্ছে প্রযুক্তিসমৃদ্ধ প্লাটফর্ম তৈরি করা, যা চাহিদা ও সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রের বর্তমান শিল্প কাঠামোকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা আমরা দেখতে পাচ্ছি শেয়ারিং ও অন-ডিমান্ড ইকোনমিতে। এসব প্রযুক্তি প্লাটফর্ম স্মার্টফোনের মাধ্যমে ব্যবহার খুবই সহজ। ফলে এ প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ভোগ্যপণ্য ও সেবা। অধিকন্তু তা কমিয়ে আনছে ব্যবসা ও ব্যক্তির সম্পদ অর্জনের বাধা। আর এতে পরিবর্তন হচ্ছে ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিবেশ। নতুন প্লাটফর্ম ব্যবসা বহু গুণে বাড়িয়ে তুলছে নতুন সেবা—লন্ড্রি থেকে শুরু করে কেনাকাটা পর্যন্ত, পার্কিংয়ের টুকটাক কাজ থেকে পর্যটনের সংবাদ পর্যন্ত। সামগ্রিকভাবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব পাঁচটি মূল প্রভাব ফেলছে—ব্যবসা, গ্রাহকের প্রত্যাশা, পণ্য উৎপাদন, সহযোগিতামূলক উদ্ভাবন ও সাংগঠনিক ধরনের ওপর।

প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটবে দ্রুতগতিতে। নতুন প্রযুক্তি বয়ে আনবে আরো নতুন নতুন প্রযুক্তি। নবপ্রযুক্তির বিকাশ, উদ্ভাবন, প্রয়োগ ও সম্প্রসারণ গাণিতিক নয়, জ্যামিতিক হারে হচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এ ঢেউ আঘাত হানছে অর্থনীতি, সমাজ, ব্যবসা ও ব্যক্তিজীবনে। নব উদ্ভাবিত যন্ত্রগুলো পরস্পর কথা বলবে, জানবে পরিস্থিতি কী কী করতে হবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। মানুষ সরলরেখায় চিন্তা করতে অভ্যস্ত। এমনি অবস্থায় চতুর্থ বিপ্লবের আগমনি প্রযুক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এ বিপ্লবের প্রভাব মানবসভ্যতাকে প্রভাবিত করবে ব্যাপকভাবে। উন্নত বিশ্বসহ সমগ্র বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে মানবসম্পদ উন্নয়নকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে। আমাদেরও সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা দিয়ে প্রযুক্তিকে এগিয়ে নেয়ার কাজও চলছে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৫ সালে আইসিটি রফতানি ৫ বিলিয়ন ডলার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ৩০ লাখে উন্নীত করা এবং সরকারি সেবার শতভাগ অনলাইনে পাওয়া নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরো ৩০০ স্কুল অব ফিউচার ও ১ লাখ ৯ হাজার ওয়াই-ফাই কানেক্টিভিটি, ভিলেজ ডিজিটাল সেন্টার ও ২৫ হাজার শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া একই সময়ে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন (আইডিটি) চালু, ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলা, শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি (এসএইচআইএফটি) স্থাপন, ডিজিটাল লিডারশিপ একাডেমি এবং সেন্টার ফর ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন প্রতিষ্ঠা করা হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির যে প্রসার ঘটেছে, তাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যেই আধুনিক রূপে জ্ঞানভিত্তিক উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভূত পরিবর্তন আনবে এ কথা অনস্বীকার্য। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিশ্ব এখন একটি ক্রান্তিলগ্নে রয়েছে, যার পরবর্তী পর্যায় হবে অধিকতর উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা। প্রযুক্তির আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ও বণ্টনের ব্যয় হ্রাস পাবে, কারণ মানুষকে সহায়তা করবে মেশিন। উন্নত দেশে, যেখানে কর্মক্ষম জনসংখ্যার ঘাটতি রয়েছে, প্রযুক্তির আবির্ভাব সেখানে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সক্ষম হবে। তাই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মানুষের জীবনযাত্রায় একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই অনেকের ধারণা। তবে উচ্চ জনসংখ্যার দেশে, যেগুলো মূলত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল, বেকার সমস্যা প্রকট হতে পারে। প্রথাগত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি, যেখানে মানবসম্পদের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, অনেক কমে আসবে। বিশেষ করে হিসাবরক্ষক, আর্থিক বিশ্লেষক, কর উপদেষ্টা, গ্রন্থাগারিক, টেলিফোন অপারেটর, নিরাপত্তারক্ষী, কোষাধ্যক্ষ, শোরুমে নিয়োজিত বিক্রয় কর্মী, ফিলিং স্টেশনের কর্মীর চাহিদা আগামী দশকের মধ্যে তলানিতে নেমে আসবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১০টি প্রযুক্তিনির্ভর—অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস, ক্লাউড টেকনোলজি, অটোনমাস ভেহিকল, সিনথেটিক বায়োলজি, ভার্চুয়াল অগমেন্টেড রিয়েলিটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবট, ব্ল্যাক চেইন, থ্রিডি প্রিন্টিং এবং ইন্টারনেট অব থিংকস বা আইওটি—এ ১০টি টেকনোলজি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে নেতৃত্ব দেবে। এসব বিষয়ের ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।

এ সমস্যা মোকাবেলায় প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে মানুষের কর্মক্ষমতাকে বাড়ানো যায় তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। মানুষকে ক্ষমতায়ন করতে হবে প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহারে। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি মানুষেরই সৃষ্টি কেবল মানুষের কাজের গতিকে বেগবান করার জন্য। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়ায় এমন সব খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। প্রশিক্ষণ হয়তো স্বল্প মেয়াদে লাভজনক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সুফলের জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে। মূলধারার শিক্ষাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন তা মানবসম্পদকে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় নমনীয়তা, চিন্তা করার ক্ষমতা ও তথ্য বিশ্লেষণের উপযোগী করে তোলে। মূলধারার শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষাকে জোরদার করতে হবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব পুরো জীবন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজের সম্পর্ক বৃহত্তর রূপান্তর হতে পারে। এ ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যে থাকা সব অংশীজনের ন্যায়সংগত অংশ ভোগ করার সুযোগ থাকতে হবে। অন্যথায় প্রান্তিকীকরণ বেড়ে যাবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
এই বিভাগের আরও খবর
- Advertisment -spot_img

সর্বাধিক পঠিত