
দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত ও পাকিস্তান। সামরিক উত্তেজনা, সীমান্ত সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক বিরোধ ছাড়াও এবার সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা জ্বলে উঠেছে ক্রিকেট মাঠে। সদ্য সমাপ্ত এশিয়া কাপ ২০২৫ ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে। ক্রিকেট ভক্তদের উৎসবের আসর পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক লড়াই ও জাতীয়তাবাদের মঞ্চে।
মোদির বার্তা: ক্রিকেটও ‘অপারেশন সিন্দুর’:
গত মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের যুদ্ধ হয়। সেই সামরিক অভিযানকে ভারত সরকার নাম দেয় ‘অপারেশন সিন্দুর’। দুই মাস পর, এশিয়া কাপ ফাইনালে পাকিস্তানকে হারানোর পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবারও সেই নাম ব্যবহার করেন।
এক্সে দেয়া বার্তায় তিনি লেখেন— ‘অপারেশন সিন্দুর এবার খেলার মাঠে। ফল একই, ভারত জয়ী। অভিনন্দন ভারতীয় ক্রিকেটারদের।’রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোদির বার্তায় স্পষ্ট হয়ে গেছে ক্রিকেটকে নতুন করে যুদ্ধের হাতিয়ার বানানো হয়েছে।
ট্রফি বিতরণে তীব্র বিতর্ক:
ফাইনালের পর ট্রফি বিতরণ নিয়েও শুরু হয় বড় বিতর্ক। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এএসসি) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্বে আছেন। নিয়ম অনুযায়ী তার হাত থেকেই ভারতকে ট্রফি নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ঘোষণা দেয়, তারা পাকিস্তানি মন্ত্রীর কাছ থেকে ট্রফি নেবে না।
বিসিসিআই প্রধান দেবজিৎ সাইকিয়া বলেন,‘আমরা পাকিস্তানের অন্যতম রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে কোনো পুরস্কার নেব না’
এ অবস্থায় এএসসি ট্রফি মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেয়। ভারতীয় দল বাধ্য হয় কাগজ ও কাঠ দিয়ে বানানো একটি ‘শ্যাডো ট্রফি’ নিয়ে উদযাপন করতে।
নকভির পাল্টা জবাব:
ভারতের আচরণের পর পাকিস্তানি মন্ত্রী মোহসিন নকভি পাল্টা মন্তব্য করেন। এক্সে তিনি লেখেন, ‘যুদ্ধ যদি গৌরবের মাপকাঠি হয়, তবে ইতিহাসে ভারতের পরাজয় বহুবার লিপিবদ্ধ আছে। ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে সেই সত্য বদলানো যাবে না। খেলায় যুদ্ধ টেনে আনা খেলাধুলার আত্মাকে কলঙ্কিত করে।‘
হাত মেলাতে অস্বীকৃতি:
এশিয়া কাপে ভারতীয় দল একাধিকবার পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রথম ম্যাচ থেকেই তারা এই আচরণ করে এবং ফাইনালেও একই ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইরফান নুরুদ্দিন বলেন, ‘ভারতীয় দলকে দুঃখজনকভাবে মনে রাখা হবে হাত না মেলানো এবং ট্রফি নিতে অস্বীকৃতির জন্য।‘ তবে তিনি নকভিকেও সমালোচনা করেন।
সম্পর্কের টানাপোড়েন:
২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর থেকে ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ রয়েছে। কেবল বহুদলীয় টুর্নামেন্টেই দুই দল মুখোমুখি হয়।
সম্পর্ক আরও খারাপ হয় এ বছরের এপ্রিল মাসে কাশ্মিরের পেহেলগামে হামলার পর। তখন বন্দুকধারীরা ২৬ জন বেসামরিককে হত্যা করে। ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে। মে মাসে আবারও দুই দেশের মধ্যে বিমান ও ড্রোন হামলা হয়।
খেলাধুলা থেকে কূটনীতি: অতীতের ভিন্ন চিত্র:
একসময় ক্রিকেট দুই দেশের সম্পর্ক মেরামতে সহায়ক ছিল। ১৯৮৭ সালে ভারত-পাকিস্তানের সীমান্তে উত্তেজনা চলাকালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়াউল হক দিল্লিতে গিয়ে ক্রিকেট ম্যাচ দেখেন। ১৯৯৯ সালে দুই দেশ পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার পরও পাকিস্তান ভারতের চেন্নাইয়ে টেস্ট খেলতে আসে। তখন দর্শকরা পাকিস্তানকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিল।
কিন্তু আজ সেই পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। লাহোরের এলইউএমএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলি খান বলেন, ‘আজকের ভারতীয় সরকারের পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব অভূতপূর্ব। ক্রিকেট এখন আর শান্তির সেতু নয়, বরং বৈরিতার প্রতীক।’
ব্যক্তিগত বন্ধনও দুর্বল:
একসময় দুই দেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল উষ্ণ। পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা আইপিএলে খেলতেন। বিরাট কোহলি বা রোহিত শর্মার মতো ভারতীয় তারকারা পাকিস্তানে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু নতুন প্রজন্মে সেই বন্ধন আর নেই।
আলি খান বলেন, ‘বর্তমান খেলোয়াড়রা কম যোগাযোগ করেছে। এমন বৈরী পরিবেশে তাদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার সুযোগ নেই।‘
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব:
বিশ্লেষকদের মতে, নরেন্দ্র মোদি কেবল আন্তর্জাতিক বার্তাই দেননি, বরং দেশীয় রাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছেন। সামনে বিহারসহ ভারতের কয়েকটি বড় রাজ্যে নির্বাচন। যুদ্ধ বা জাতীয়তাবাদী আবেগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা নেয়া তার কৌশল।
পাকিস্তানের সাবেক হাইকমিশনার আবদুল বাসিত বলেন, ‘মোদি রাজনৈতিকভাবে সবকিছু ব্যবহার করেন। যুদ্ধ–উন্মাদনা তাকে ভোটে সুবিধা দেয়।’
এশিয়া কাপ ২০২৫ প্রমাণ করল, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে। যে খেলাটি একসময় বন্ধুত্বের সেতু গড়েছিল, সেটিই আজ পরিণত হয়েছে বৈরিতার নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে। ক্রিকেটে হাসি-খুশি মুহূর্তের বদলে এখন ছড়িয়ে পড়ছে রাজনৈতিক বিষ। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের জনগণ শান্তি চায়, কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংকীর্ণ স্বার্থে ক্রীড়াকেও রাজনীতির অস্ত্রে পরিণত করছে।
(আলজাজিরা থেকে অনূদিত)
/এমএমএইচ














