চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা পণ্যবাহী কনটেইনারের স্তূপ বাড়ছে। ট্রেন সংকটের কারণে বন্দরের ডিপো থেকে প্রতিদিন কনটেইনার পরিবহন করা যাচ্ছে না। তাতে সময়মতো পণ্য পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেইসঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে কনটেইনারের জট। এটি দ্রুত নিরসন করা না গেলে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। দীর্ঘদিন পণ্য আটকে থাকায় বাজারে প্রভাব পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ব্যবসায়ীরা।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ট্রেন সংকটে প্রতিদিন ঢাকা ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) প্রয়োজনীয় সংখ্যক কনটেইনার পাঠানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন কনটেইনার পরিবহনের জন্য চার-পাঁচটি ট্রেনের প্রয়োজন হলেও দুটিও পাচ্ছে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। আবার কোনোদিন মিলছে না একটিও। গত দুই মাস ধরে এ অবস্থা বিরাজমান। মূলত এজন্যই বন্দরে পণ্যবাহী কনটেইনারের ভয়াবহ জট দেখা দিয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৮৭৬টি। অথচ শনিবার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যা পর্যন্ত কনটেইনার পড়ে ছিল দুই হাজারের বেশি। এর বাইরে বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজে আরও প্রায় এক হাজার কনটেইনার আছে। যেগুলোর গন্তব্যও রাজধানীর কমলাপুর। ইয়ার্ডে কনটেইনার রাখার জায়গা না হওয়ায় কমলাপুরগামী কিছু কনটেইনার এনে রাখা হয়েছে ট্রানজিট পয়েন্টে। অনেকটা খোলা স্থানে রাখায় এসব পণ্যবোঝাই কনটেইনারের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই প্রতিদিন পর্যাপ্তসংখ্যক ট্রেন সরবরাহ করা না হলে বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার জট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। পাশাপাশি বন্দরে নোঙর করা জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাসেও দেরি হবে। যা পুরো সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিন অন্তত ২০০টি কনটেইনার পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়াগন ও ইঞ্জিন সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
গত ২১ আগস্ট বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের কমলাপুর আইসিডিগামী কনটেইনারের পরিমাণ বেড়েছে। যা রেলওয়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগের মাধ্যমে সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া প্রায় ১০ হাজার কনটেইনার নিলামের অপেক্ষায় আছে। এই ১০ হাজার এবং আইসিডির দুই হাজারসহ প্রায় ১২ হাজার কনটেইনার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রেলওয়ের ট্রেন সংকটের কারণে কমলাপুর আইসিডিগামী কনটেইনারের জট অনেক বেড়েছে। ইয়ার্ডে ৮৭৬টি কনটেইনার ধারণক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে দুই হাজারের বেশি জমেছে। এ পরিস্থিতিতে রেলওয়েকে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছি। যাতে দৈনিক চার-পাঁচটি ট্রেন পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি ট্রেনে ৩১টি করে কনটেইনার পরিবহন করা যায়। এখন দৈনিক এক থেকে দুটি ট্রেন পরিচালনা করছে তারা। আবার কোনোদিন পাওয়া যাচ্ছে না।’
এদিকে, কনটেইনার পরিবহনে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন আমদানিকারকরা। পণ্যবাহী এসব কনটেইনার ছয় থেকে ১৬ দিন পর্যন্ত ইয়ার্ডে পড়ে থাকায় পণ্যের দামে ও বাজারে প্রভাব পড়ছে।
শিপিং এজেন্টস এমএসসির হেড অব অপারেশন মো. আজমীর হোসাইন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বন্দরের বড় একটি স্থান এসব কনটেইনার দখল করে রাখায় নতুন কনটেইনার খালাসে দেরি হচ্ছে। এতে বাড়তে পারে আমদানি করা পণ্যের দাম। যার প্রভাব পড়বে বাজারে। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরাও। বিষয়টি সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার সংশ্লিষ্টদের।’
রেলওয়ে সূত্র জানায়, রেলপথে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কমলাপুর ডিপোর মধ্যে কনটেইনার পরিবহন শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। তবে শুরু হওয়ার প্রায় ৩৮ বছর পরও এই পথে বন্দর থেকে পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ ৩ শতাংশেরও কম। অথচ এটি সবচেয়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রেলের ইঞ্জিন সংকট প্রকট। যে কারণে বন্দরের চাহিদামতো কনটেইনার পরিবহনে ইঞ্জিন সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিষয়টি সম্পর্কে রেলের ও বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অবগত আছেন।’









